হাফিজুল ইসলাম লস্কর
দুনিয়ার জীবন মানুষের কাছে দীর্ঘ ও নিশ্চিত ঠিকানা মনে হলেও প্রাকৃতিকভাবে এর রূপ সম্পূর্ণ ক্ষণস্থায়ী। মরুভূমির পিচঢালা হাইওয়ে বা দূরবালুচরে তীব্র গরমে যে জলাঞ্চল চকচক করে, কাছে গেলে যার অস্তিত্ব মেলে না- পার্থিব মোহও তেমনি এক অলীক মরীচিকা। মানুষ ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও খ্যাতির পেছনে সারাজীবন ছুটে চলে এই আশায় যে এগুলো আত্মাকে শান্তি দেবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পথিকের সামনে নিছক বালু ছাড়া আর কিছু উপহার দেয় না।
দৃষ্টিবিভ্রম ও পার্থিব চাকচিক্য,
বিজ্ঞান বলে, আকাশের নীলিমা বা মহাশূন্যের অন্ধকার নির্দিষ্ট কোনো কঠিন সত্য নয়, বরং বায়ুমণ্ডলে আলোর বিক্ষিপ্তকরণ (Rayleigh scattering) ও প্রতিসরণের দৃষ্টিবিভ্রম মাত্র। ঠিক তেমনি, পৃথিবীর এই বর্ণিল চাকচিক্য ও কৃত্রিম সৌন্দর্য চিরস্থায়ী কোনো বাস্তবতা নয়। মহাশূন্যতায় সূর্য সর্বদা শ্বেতবর্ণের, তেমনি মহাজাগতিক বিচারে দুনিয়ার রঙ-রূপও সাময়িক। সূর্যাস্তের লালিমার মতো এই জীবনের আয়ুও ফুরিয়ে আসে। জলের নিচে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখে যেমন মনে হয় জলের ভেতরেই আলো জ্বলছে, অথচ উৎস বহু দূরে আসমানজুড়ে, তেমনি মানুষ দুনিয়ার বাহ্যিক প্রাপ্তি দেখে ভুল করে এবং আসল চিরন্তন উৎসকে ভুলে থাকে।
ইসলামি জীবনদর্শন ও পরকালের প্রস্তুতি,
ইসলামি জীবনদর্শন এই পার্থিব অস্তিত্বকে কেবল পরীক্ষাক্ষেত্র ও পরকালের শস্যক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কোরআনে কারীমে দুনিয়াকে খেল-তামাশা ও প্রতারণার উপকরণ বলা হয়েছে। মানুষের চোখের সামনে যা কিছু সুন্দর ও লোভনীয় মনে হয়, মৃত্যু ও সময়ের ব্যবধানে সেগুলোর সব চাকচিক্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। রঙধনুর মতো দর্শকের অবস্থানের ওপর নির্ভর করা এই অপটিক্যাল স্থায়িত্বের কোনো মূল্য আখিরাতের চিরন্তন জীবনের কাছে নেই।
প্রকৃত মুমিনের পথচলা,
প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি যিনি এই দৃষ্টি বিভ্রমের পেছনে না ছুটে আসল সত্যের সন্ধান করেন। ক্ষণস্থায়ী এই ভ্রমের মোহে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে আত্মশুদ্ধি ও পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই বুদ্ধিমান মানুষের একমাত্র কাজ। দুনিয়ার চাকচিক্য যেন মানুষের অন্তরে স্থায়ী প্রীতি বা অহংকার তৈরি না করতে পারে, সে বিষয়ে কোরআন ও হাদিস বারবার সতর্ক করেছে। মোহের আবরণ ছিড়ে যারা প্রকৃত রবের সান্নিধ্য খোঁজেন, তারাই কেবল এই মরীচিকার মায়া থেকে মুক্তিলাভ করতে পারেন।
লেখক: হাফিজ মাওলানা ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, ইউনানী সংগঠক ও চিকিৎসক।