হাফিজুর রহমান কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধিঃ
বুশরা, এমআর,গ্রুপ, বর্ষা, আরডিপি, যুবক, ডেসটিনি, নলতার আলোর দীশা, পে-টু ক্লিকের মতন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে জেলা, উপজেলা জুড়ে অধিক লাভের প্রতারণার জাল বিস্তার করে হাজার হাজার গ্রাহকে সর্বশান্ত করে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে উধাও হলেও আজ পর্যন্ত তার কোন প্রতিকার মেলেনি। এর মধ্যে যখন বুশরা, এমআর গ্রুপের শরিফুল ইসলাম, পলাশ সহ অন্যান্যদের হন্যে হয়ে খুঁজে গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত সাতক্ষীরা সহ বিভিন্ন থানার অফিসে হানা দিয়ে চলেছে । ঠিক তখনই গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বুশরার সাবেক শিষ্য নলতা ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেন সহ প্রতারক চক্র বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের জন্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন সাইনবোর্ড লাগিয়ে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল ও অনুমোদন বিহীন নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ এর নামে সাড়ে ৪ হাজার গ্রাহক ও ৭০ জন শেয়ার হোল্ডারদের প্রায় ৫ কোটি টাকা নিয়ে তালা ঝুলিয়ে রাতারাতি পালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আকরাম হোসেন কিছুই না জানলেও উপজেলা জুড়ে বৈধ, অবৈধ সমবায় সমিতির ঘুষের টাকায় অনুমোদন বিহীন এসি নিজের সরকারি অফিসে লাগিয়ে দিব্যি আরাম আয়েশে অফিস করলে ও দেখার কেউ নেই। এই ভাবে উপজেলা জুড়ে , গ্রামে গঞ্জে,পাড়া মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতন সমবায় সমিতি খুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বিহীন মাইক্রো ক্রেডিট, সঞ্চয় ঋণদানের মত কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের কোন তদারকি না থাকায় প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে গেরামের সহজ সরল খেটে খাওয়া জনগন। এ সুযোগে সমবায় সমিতির সাইন বোর্ডের আড়ালে এক শ্রেণীর সুদখোরেরা কোটি কোটি টাকার সুদের ব্যবসা চালিয়ে গেলেও এ সমস্ত রাঘব বোয়ালরা রয়েছে ধোরাছোয়ার বাইরে।
কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা গ্রামের শেখ ফজর আলীর পুত্র বুশরা গ্রুপের শিষ্য ও সাবেক কর্মকর্তা মিলন হোসেন, একই গ্রামের শেখ দাউদ আলীর পুত্র হারুন অর রশিদ এবং ঠাকুর গাঁও জেলার সুজন আহমেদ নামে এই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র চিকিৎসা সেবার আড়ালে নতুন করে প্রতারণার জাল বিস্তার করে। পরিকল্পনা মোতাবেক ২০২০ সালের মার্চ মাসে বুশরার আদলে নলতা ম্যাটসের সামনে ভাড়াসিমলার মালেকের তৃতীয় তলা বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে প্রথমে নলতা ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতাল নামে চিকিৎসা সেবা শুরু করে। প্রথমে চটকদার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণার জাল বিস্তর করে। ২০২৪ সালে বুশরার আদলে নলতা ডায়াবেটিক ও জেনারেল হাসপাতালের নামে অনুমোদন বিহীন নলতা ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ নামে একটি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি বা সমিতি গঠন করে। এরপর শুরু হয় প্রতারণার কৌশল প্রথমে কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, এবং শ্যামনগর উপজেলাকে টার্গেট করে মাসিক ২৫/৩০ হাজার টাকা বেতনে প্রতিটি ইউনিয়নে কর্মী নিয়োগ করে। তাদের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া এবং আমানত ও জমাকৃত টাকা ৩/৪ বছরে দ্বিগুণ এবং লাখে আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সাড়ে ৪ হাজার গ্রাহক এবং ৭০ জন শেয়ার হোল্ডারের নিকট থেকে প্রায় প্রায় ৫ কোটি টাকা আমানত নিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম চালাতে থাকে। এরমধ্যে সিটি স্ক্যান মেশিনের জন্য নলতার একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে ৩০ লক্ষ টাকা এ ঋণ নেয়। এইভাবে সমিতির গ্রাহক এবং শেয়ার হোল্ডারদের টাকায় নিজেরা প্রাইভেট কারে চলাচল ছাড়া আলিশান বাড়িতে বসবাস করে দেশ-বিদেশে ফুর্তি করে বেড়িয়ে আসছিল। গত এক বছর ধরে নিয়োগ কৃত বিভিন্ন উপজেলার কর্মীদের বেতন না দেওয়া ,সমবায়ী সঞ্চয়ীদের টাকা ফেরত, লোভ্যাংশ না দেওয়ায় বিক্ষোভের ডানা বাঁধে। এতে করে পরিচালনা পর্ষদের অনেক পরিচালক গোপনে টাকা তুলে নিয়ে কেটে পড়ে। সমবায়ি, শেয়ার হোল্ডারদের টাকা না দেওয়া ও টালবাহানার অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতা ও আশ্বাসে কয়েক মাস থমকে থাকে। সমিতির সদস্যরা চিকিৎসা ,ঈদ খরচের জন্য সঞ্চয়ী টাকা উঠাতে আসলে না পেয়ে অনেক সদস্য অর্ধ হারে, অনাহারে অতি কষ্টে জীবন যাপন করতে থাকে। এর মধ্যে অনেকেই সঞ্চয়ী টাকা উঠাতে না পেরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। এতে করে গ্রাহক এবং শত শত সঞ্চয়ী আমানতকারী শেয়ার হোল্ডাররা গত ১০ আগস্ট বেলা ১১ টা হতে দিনব্যাপী হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ, ঘেরাও কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালক মিলনের মিলনসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের হাসপাতালে অবরুদ্ধ করে রাখে। ঐ সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের সামনে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে সে যাত্রায় রেহাই পায়।
সোমবার সকালে নলতা ডায়াবেটিক ও জেনারেল হাসপাতাল কল্যাণ সমিতির মাঠকর্মী চম্পা সরকার, আমেনা বেগম, ফিরোজা, প্রভাতী, সহ একাধিক ভুক্তভোগী মাঠ কর্মী, গ্রাহক জানান প্রতিদিন টাকার জন্য তাদের বাড়িতে এসে গ্রাহকরা টাকা ফেরতের দাবিতে মারপিট হুমকি দিয়ে চলে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে জানান গ্রাহকরা আমাদের কথামতো টাকা রেখেছে। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকা না দিয়ে বিভিন্ন তালবাহানা করে আসছে। আজ এসে শুনি কয়েকদিন আগে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের জন্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাতারাতি পালিয়ে গেছে। এখন আমরা গ্রাহকদের টাকা না দিয়ে বাড়িতে ফিরতে, না পেরে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। রতন পুরের ফজলু, শিমুলিয়ার নুরুল, থালনার প্রসাদ, জানান ৬ বছরে দ্বিগুণ হবে এই আশ্বাসে আমরা প্রত্যেকে ১৫ লক্ষ টাকা করে রেখেছি এখন শুনছি তারা পালিয়ে গেছে। মিলন সহ অন্যান্য পরিচালকদের মোবাইলে চেষ্টা করেও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এই টাকার জন্য কার কাছে যাবো ,কার কাছে নালিশ করবো। এর আগে বর্ষা, বুশরা, আলোর দিশার হাজার হাজার গ্রাহক টাকার জন্য জেলা ব্যাপী দাপিয়ে বাড়ালেও এখনো পর্যন্ত কেউ টাকা ফেরত পায়নি। নাম না প্রকাশ করার শর্তে মৌতলার দু,জন শেয়ার হোল্ডার জানান ৪ বছরে ২০ লক্ষ টাকা করে রাখলেও আজও পর্যন্ত কোন লভ্যাংশ পাওয়া তো দূরের কথা জমাকৃত শেয়ারর টাকা ফেরত পাবো কিনা এমনই অভিব্যাক্ত প্রকাশ করে আমাদের কন্ঠকে জানান। এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেনের ব্যবহৃত ০১৭২৭৯৬৬৪০৬ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে বন্ধ পাওয়া যায় যে কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে গিয়ে সমবায় কর্মকর্তা আকরাম হোসেনকে না পেয়ে তার ব্যবহারিত ০১৯৭৩১২১২৭৫ নং মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে বন্ধ পাওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। জেলা, উপজেলা পর্যায়ে সমবায় সমিতির কার্যক্রম নজর দারিতে আনার জন্য জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।