ঢাকা   ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ । ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
রাজস্থলীতে বিদ্যালয়ের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ, সিলেটে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলার আসামি আওয়ামী লীগ নেতা জিলু গ্রেফতার চিত্রনায়িকা মৌসুমীকে নিয়ে ‘বানোয়াট অশ্লীল ভিডিও’র গুজব ছড়ানোর তীব্র নিন্দা চলচ্চিত্র অঙ্গনে: পরিচালক রবিউল ইসলাম রাজের কঠোর প্রতিক্রিয়া ঠাকুরগাঁওয়ে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে কিশোরীকে গ-ণধ-র্ষণ, প্রেমিকসহ গ্রেপ্তার ৩ সান্তাহারে নিখোঁজের ৭ ঘণ্টা পর ৬ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার: কানের দুলের লোভে হত্যা, গ্রেফতার প্রতিবেশী দম্পতি গোদাগাড়ী ৩১ শয্যা হাসপাতাল: অ্যাম্বুলেন্স নেই, পরিচ্ছন্নতাকর্মী শূন্য—ধুঁকছে চিকিৎসাসেবা রংপুরে ধর্ষণ মামলার আসামি নোয়াখালী থেকে গ্রেফতার তানোরে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তায় মুখরিত ‘স্টার্টআপ ও বিজ্ঞান প্রজেক্ট প্রদর্শনী’ 🎯সিরিয়াল কিলার’গোলাম মোর্শেদ গ্রেপ্তার:গাজীপুরে মিলল হদিস,স্বীকার করল রোমহর্ষক অপরাধের দায়! বিলাইছড়িতে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শন বিষয়ক প্রদর্শনী ও সভা অনুষ্ঠিত

একান্নবর্তী পরিবারের বিদায়, যান্ত্রিকতার গহ্বরে আমাদের সামাজিক শেকড়

okmedia56@gmail.com
  • প্রকাশিত : রবিবার, জুন ১৪, ২০২৬
  • 29 শেয়ার

ডা. হা. মাও. হাফিজুল ইসলাম লস্কর

 

 

​একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সময়ে ‘সুখী পরিবার’ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একক বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ছবি। স্বামী, স্ত্রী আর বড়জোর দুটি সন্তান, এটাই যেন আধুনিকতার মানদণ্ড। কিন্তু এই চাকচিক্যময় ক্ষুদ্র পরিসরের আড়ালে আমরা কী হারাচ্ছি, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। গবেষণায় একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল একটি সামাজিক পরিবর্তন নয়, বরং আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক মহাপ্রস্থান।

​বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের গড় পরিবারের সদস্য সংখ্যা এখন ৪-এর নিচে (৩.৯৮ জন)। এক দশক আগেও এই চিত্রটি ভিন্ন ছিল। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, যৌথ পরিবারের সেই বটবৃক্ষের ছায়া ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গ্রামীণ জীবনেও এখন শহুরে যান্ত্রিকতার ঢেউ লেগেছে; যেখানে একসময় পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু নিয়ে ২০-৩০ জনের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা।

​যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নতুন প্রজন্মের ওপর। একটি একক পরিবারে সন্তানরা বেড়ে উঠছে চার দেয়ালের মাঝে, যেখানে বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত। ফলে শিশুরা দাদা-দাদি বা চাচা-ফুফুদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে- ​সহনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এতে অন্যের মতামতকে সম্মান জানানোর সুযোগ কমছে। প্রবীণদের তারা পরিবারের সদস্যের চেয়ে ‘মেহমান’ হিসেবে দেখতেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। মানুষের চেয়ে যান্ত্রিক গ্যাজেটের প্রতি আসক্তি বাড়ছে, যা তাদের আবেগহীন করে তুলছে।

​বর্তমান সময়ের অত্যন্ত বেদনাদায়ক অংশটি হলো প্রবীণদের সামাজিক অবস্থান। একসময় যে কর্তার আদেশে পুরো পরিবার চলত, আজ সেই কর্তাই নিজ পরিবারে অবাঞ্ছিত। আধুনিকতার নামে আমরা এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়েছি যে, উচ্চশিক্ষিত ও বিত্তশালী পরিবারের সন্তানরাও বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে দ্বিধা করছে না। বৃদ্ধাশ্রমের অধিকাংশ বাসিন্দাই উচ্চবিত্ত পরিবারের; যারা মূলত আবেগীয় দীনতার শিকার।

​মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে, বেড়েছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। মানুষ এখন নিজের গোপনীয়তা এবং স্বাধীন আয়-ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এই ‘স্বাধীনতা’ কি প্রকৃত সুখ দিচ্ছে? সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জাপানের মতো উন্নত রাষ্ট্র যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে যৌথ পরিবারকে উৎসাহিত করছে, সেখানে আমরা আধুনিক হতে গিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছি। রবিনসন ক্রুসোর মতো নির্জন দ্বীপে বাস করা আর আধুনিক ফ্ল্যাটে একা বাস করার মধ্যে ব্যবধান খুব সামান্যই।

​সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের হাতের মুঠোয় এনে দিলেও হৃদয়ের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। সশরীরে উপস্থিত হয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চিরাচরিত প্রথা এখন ‘লাইক-কমেন্ট’ আর ‘হাই-হ্যালো’তে সীমাবদ্ধ। এর ফলে সামাজিক বন্ধনগুলো ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে এক রসকষহীন সমাজব্যবস্থা।

​একান্নবর্তী পরিবার ছিল আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার দুর্গ। বিপদে পাশে দাঁড়ানোর লোক, উৎসবে আনন্দের জোয়ার আর বার্ধক্যের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছিল এই যৌথ পরিবার। যুগের প্রয়োজনে হয়তো পরিবারের কাঠামো ছোট হচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের বন্ধনগুলো যদি যান্ত্রিক হয়ে যায়, তবে সমাজ হিসেবে আমরা দেউলিয়া হয়ে পড়ব। আধুনিকতার অর্থ নিঃসঙ্গতা নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রবীণ ও নবীনদের মাঝে সহাবস্থান নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আগামীর লক্ষ্য।

লেখক,
ডা. হা. মাও. হাফিজুল ইসলাম লস্কর।
সাবেক ইন্টার্ণী চিকিৎসক- সিলেট সরকারী ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক-বিএমএসএস কেন্দ্রীয় কমিটি।
সাংগঠনিক সম্পাদক- বাংলাদেশ ইন্ডিজেনাস মেডিকেল সোসাইটি।
সাংগঠনিক সম্পাদক- বৃহত্তর সিলেট জেলা অনলাইন প্রেসক্লাব।
সম্পাদক ও প্রকাশক- শব্দের আলাপন।
সম্পাদক- সাপ্তাহিক ইউনানী কন্ঠ।
সদস্য সচিব- আল ইখওয়ান সোসাইটি।
সদস্য – ইচ্ছাশক্তি সাহিত্য পরিবার।
সদস্য- গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাব।
সাবেক শিক্ষক- জামেয়া দারুল উলূম সিলেট।
সাবেক শিক্ষক- ফাতেমা (রা.) নূরিয়া মহিলা মাদ্রাসা।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ

© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৪