—মাধুরী ব্যানার্জী
বাড়ির দক্ষিণমুখী ছোট্ট ব্যালকনিটা ছিল নীলাঞ্জনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। দিনের শেষে সেখানে বসে আকাশের রং বদলানো দেখত সে। কখনও সোনালি, কখনও কমলা, কখনও বা গভীর নীল। কিন্তু আজকাল রঙগুলোও যেন তার চোখে ধরা পড়ত না।
কয়েক মাস আগে মাকে হারিয়েছে নীলাঞ্জনা। ঘরের সবকিছু আগের মতোই আছে, অথচ কিছুই আগের মতো নেই। রান্নাঘরে মায়ের গানের সুর নেই, সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালানোর তাড়া নেই, আর নেই সেই স্নেহভরা ডাক—”নীলু, চা খেয়ে নে।”
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে ব্যালকনিতে এসে বসে। নিস্তব্ধতাকে সঙ্গী করে দূরের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, তার মনটাও যেন এক নিস্তব্ধ ব্যালকনি—যেখানে কেউ আসে না, কোনো শব্দ পৌঁছায় না।
একদিন হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশের বাড়ির ছাদে। একটি ছোট্ট মেয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টা করছে। বারবার ঘুড়ি পড়ে যাচ্ছে, তবু সে হাল ছাড়ছে না। মেয়েটির মুখে অদ্ভুত এক হাসি।
নীলাঞ্জনা মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল। শেষ পর্যন্ত ঘুড়িটি আকাশে উড়ে উঠল। মেয়েটি আনন্দে হাততালি দিল।
সেই মুহূর্তে নীলাঞ্জনার মনে হলো, জীবনও যেন ওই ঘুড়ির মতো। বারবার পড়ে যায়, সুতো জড়িয়ে যায়, তবু আবার উড়তে শেখে।
সন্ধ্যার বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিল। অনেকদিন পর সে গভীর শ্বাস নিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “মা, তুমি নেই, কিন্তু তোমার শেখানো সাহসটা এখনও আছে।”
দূরে একটি তারা জ্বলে উঠেছে। নীলাঞ্জনার মনে হলো, নিস্তব্ধ মনের ব্যালকনিতে যেন একটি ছোট্ট আলো এসে বসেছে।
সেদিনের পর থেকে ব্যালকনিটি আর শুধু নীরবতার স্থান রইল না। সেখানে প্রতিদিন একটু করে জন্ম নিতে লাগল নতুন আশা, নতুন সাহস, আর বেঁচে থাকার এক নরম আলো।