খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন :
সামাজিক বন্ধন কোনো আইন দিয়ে তৈরি হয় না, এটা তৈরি হয় হৃদয়ের সুতোয়। যে সুতো ছিঁড়ে গেলে পরিবার এলোমেলো হয়, সমাজ বিশৃঙ্খল হয়, আর রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়ে ফেলে।
আমরা এমন এক বাংলাদেশকে মনে করতে পারি, আশির দশক পর্যন্ত যার চিত্র ছিল অন্য রকম। পাড়া-মহল্লা ছিল একেকটি পরিবার। একজন অসুস্থ হলে পুরো মহল্লা তার সেবায় ছুটে আসত। একজন মুরব্বির একটি কথায় থেমে যেত ঝগড়া, শাসনের মধ্যে ছিল স্নেহ, আর শ্রদ্ধার মধ্যে ছিল আত্মার বন্ধন। মানুষে মানুষে মমত্ববোধই ছিল সমাজের সংবিধান।
নব্বইয়ের পর থেকে সেই সুতোয় টান পড়তে শুরু করলো। ব্যক্তিস্বার্থ, আত্মকেন্দ্রিকতা আর অহংকার এসে গ্রাস করল সামষ্টিক মূল্যবোধকে। আমরা শুনতে শুরু করলাম, ‘আমার সন্তানকে শাসন করার সে কে?’ এই একটি বাক্যই সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দিল। মুরব্বিরা আত্মসম্মানের ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, ‘দেখেও না দেখার’ সংস্কৃতি তৈরি হলো। শাসন উঠে গেল, বারণ উঠে গেল, আর সেই শূন্যতা দখল করল উচ্ছৃঙ্খলতা, মাদক, কিশোর গ্যাং আর পারস্পরিক অশ্রদ্ধা।
সমাজের এই চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে রাষ্ট্রে। একসময় এই রাষ্ট্রেও কিছু অভিভাবক ছিলেন। তাঁরা দল-মত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনীতিবিদদের মনে করিয়ে দিতেন – ‘তোমাদের মধ্যে শত্রুতা নেই, তোমাদের প্রতিযোগিতা আদর্শের।’ তারা ভাঙা সেতু জোড়া লাগাতেন। আজ সেই অভিভাবকহীন রাষ্ট্রে রাজনীতি হয়ে গেছে নিছক ক্ষমতার খেলা। জোট হয় স্বার্থে, ভাঙে স্বার্থে। গতকালের মিত্র আজকের শত্রু। আদর্শের লড়াই পরিণত হয়েছে জানের শত্রুতায়। এটি একটি জাতির জন্য কতটা ভয়াবহ, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
আমরা ভুলে গেছি, রাষ্ট্র মানে শুধু ভূখণ্ড নয়, রাষ্ট্র মানে সংবিধানের শাসন আর জনগণের দেশপ্রেম। আর সংবিধান তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জীবিত থাকে।
তাহলে উত্তরণের পথ কোথায়? হতাশার অন্ধকারে ডুবে থাকা নয়, আমাদের ফিরতে হবে শেকড়ে। একটি সভ্য ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে আমাদের এসব স্তম্ভকে আবার শক্ত করতে হবে:
পরিবার থেকে পাড়ায় – মুরব্বিতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন: আমাদের সন্তানকে আবার শেখাতে হবে, পাড়ার প্রতিটি মুরব্বি তার অভিভাবক। রাষ্ট্র আইন দিয়ে সব ঠিক করতে পারবে না। সামাজিক শাসনকে ফিরিয়ে আনতে হবে সম্মানের সাথে। মসজিদ, মন্দির, স্কুলের উঠানে আবার বসুক প্রবীণদের পরামর্শ সভা।
রাজনীতিতে আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা: রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, ক্ষমতা উদ্দেশ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। উদ্দেশ্য হলো জনসেবা। দলগুলোর মধ্যে একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রয়োজন – আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু নই। দিনশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশি। ক্ষমতার পালাবদল হবে সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিহিংসা দিয়ে নয়।
ধর্মীয় মূল্যবোধকে বিভেদ নয়, ঐক্যের শক্তি করা: বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান – প্রতিটি ধর্মই সততা, মানবতা, পরোপকার আর ন্যায়ের কথা বলে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানিয়ে, ধর্মের প্রকৃত মানবিক শিক্ষাকে – সত্য বলা, আমানত রক্ষা করা, প্রতিবেশীর হক আদায় করা – রাষ্ট্রীয় চরিত্রে পরিণত করতে হবে। উদারনৈতিক মানে ধর্মহীনতা নয়, উদারনৈতিক মানে সব মত ও পথকে শ্রদ্ধা করা।
সততা ও দেশপ্রেমকে একমাত্র যোগ্যতা করা: দুর্নীতি যখন নিয়ম হয়ে যায়, তখন মেধা পালিয়ে যায়। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে – চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতিতে – সততাকে পুরস্কৃত করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে শেখাতে হবে, দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা হাতে স্লোগান নয়, দেশপ্রেম মানে ঘুষ না খাওয়া, আইন মানা, অন্যের অধিকার নষ্ট না করা।
একটি অভিভাবক পরিষদের স্বপ্ন: দলীয় পরিচয়ের বাইরে দেশের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, আলেম, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পেশাজীবীদের নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘জাতীয় বিবেক’ গড়ে উঠতে পারে, যারা সংকটে জাতিকে পথ দেখাবে, রাজনীতিবিদদের সংযত করবে।
বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে আমাদের আবার মানুষ হতে হবে। ইট-পাথরের উন্নয়নের চেয়ে বেশি জরুরি মনের উন্নয়ন। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ পাড়া থেকে শুরু করি – একজন মুরব্বিকে সালাম দিই, একজন প্রতিবেশীর খোঁজ নিই, ভিন্ন মতের একজনকে বুকে টেনে নিই।
কারণ, রাষ্ট্রের ভিত্তি সংসদ ভবনে নয়, রাষ্ট্রের ভিত্তি মানুষের মনে। সেই মনে যখন আবার মমতা, শ্রদ্ধা আর দেশপ্রেম জাগবে, তখনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি সভ্য, মানবিক ও উদারনৈতিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবে।
(বি. দ্র. ছবি ও লেখা তৈরি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।)
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং আহ্বায়ক: নিরাপদ খাদ্য খাই (নিখাখা)।