বিশ্লেষকঃ-এম,আর সুমন
বাংলা চলচ্চিত্রের অমর নায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সবার কাছে প্রিয় সালমান শাহ নামে পরিচিত, তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কাটেনি রহস্যের জট। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর পর থেকেই পরিবার, শুভানুধ্যায়ী এবং ভক্তরা একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছেন।
সালমান শাহর বাবা মরহুম কমরউদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক আত্মহত্যা মেনে নেননি। সাংবাদিক ও লেখক সুপন রায়ের ‘সালমান শাহ্র অজানা কথা’ বই থেকে সংগৃহীত এবং এই দুই অভিভাবকের দৃষ্টিতে উঠে আসা ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্যতা ও প্রশ্ন নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ঝুলন্ত দেহ ও মরদেহের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা
লাশ আড়াল করার চেষ্টা: সালমানের দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় কেন প্রতিবেশী, বাবা-মা কিংবা পুলিশ—কাউকে সঙ্গে সঙ্গে দেখানো হলো না?
বঁটি দিয়ে রশি কাটা: পুলিশ বা পরিবারের সদস্যদের আসার আগেই সালমানের সহকারী আবুলের উপস্থিতিতে কেন কাজের মেয়ে ডলি বঁটি দিয়ে গলায় পেঁচানো রশি কাটতে গেলেন?
শারীরিক লক্ষণ: সাধারণত ফাঁসি বা ঝুলে মৃত্যুর ক্ষেত্রে জিহ্বা বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও সালমানের মরদেহে এমন কোনো লক্ষণ ছিল না কেন?
২. আলামত ও পোশাক পরিচ্ছদের গরমিল
পোশাকের রহস্য: সারারাত ব্যবহারের পরও সালমানের পরিহিত শর্টস কীভাবে একদম নতুন ও ধবধبে পরিষ্কার থাকল?
চিকিৎসায় অবহেলা: দড়িতে ঝুলে থাকার পরও মানুষের প্রাণ থাকার সম্ভাবনা থাকে, অথচ তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলো না কেন?
মেঝেতে রেখে নানা কাণ্ড: হাসপাতালে নেওয়ার বদলে কেন তাকে মেঝেতে শুইয়ে রেখে পানি ঢালা এবং তেল মালিশ করা হয়েছিল?
৩. ঘটনার আগের ও পরের পারিপার্শ্বিক অদ্ভুত ঘটনা
সিকিউরিটির লাগেজ নিয়ে প্রস্থান: মৃত্যুর দিন ভোরবেলায় সিকিউরিটি গার্ড খালেক কেন বড় বড় তিন-চারটি লাগেজ নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে চলে গেলেন?
ফ্যানের রঙ বদল: মৃত্যুর আগের দিন রাতে যে ভাঙা সিলিং ফ্যানটি দেখা গিয়েছিল, পরবর্তীতে উদ্ধার করা ভাঙা ফ্যানের রঙ আগেরটির সাথে মিলল না কেন?
আনসারি মেশিন উধাও: সালমানের ব্যবহৃত টেলিফোনের সাথে সংযুক্ত ‘আনসারি মেশিন’টি (কল রেকর্ডিং ও ডিসপ্লে ডিভাইস) রহস্যজনকভাবে কোথায় হারিয়ে গেল?
৪. পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের সন্দেহজনক ভূমিকা
বাবার প্রবেশে বাধা: মৃত্যুর দিন সকালে সালমানের নিজ বাবাকে কেন তার সাথে দেখা করতে দেওয়া হলো না?
অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা: সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরীকে কেন সেদিন (৬ সেপ্টেম্বর) ফ্ল্যাটে প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়েছিল?
লাশের সাথে অনীহা: বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সালমানের স্ত্রী সামিরা কেন মরদেহের সাথে হাসপাতালে গেলেন না?
সামিরার মায়ের আগমন: সামিরার মায়ের হুট করে সালমানের মৃত্যুর ঠিক দুদিন আগে ঢাকায় আসার কারণ কী ছিল?
সহকারীদের নিরাপত্তা: সালমানের সহকারী আবুল এবং কাজের মেয়ে ডলি ও মনোয়ারাকে কেন সামিরার বাবা-মার জিম্মায় রাখা হয়েছিল?
অসুস্থতায় দূরত্ব: সালমানের অসুস্থতার কঠিন সময়ে সামিরা একবারের জন্যও তাকে দেখতে এলেন না কেন?
৫. উদ্ধারকৃত আলামত ও মানসিক চাপের অভিযোগ
স্যুটকেসের সন্দেহজনক সামগ্রী: মৃত্যুর পর স্যুটকেস থেকে ভেজা কাপড়, খালি অ্যাম্পুল এবং সিরিঞ্জ পাওয়ার বিষয়টি কার ইশারা ছিল?
তাবিজ ও কুসংস্কার: সালমানের ফ্ল্যাটে অসংখ্য তাবিজ এবং চিনি পড়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা তাকে বশীভূত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের।
হুমকি ও মানসিক চাপ: সালমানকে উদ্দেশ্য করে সামিরার লেখা বেশ কিছু চিঠিতে সরাসরি হুমকি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যকে বিয়ের গুঞ্জন: সুমিত নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করার কথা বলে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল।
৬. ঘটনার রাতের অন্যান্য অসঙ্গতি
দরজা আটকানোর ঘটনা: রাতে ঘরের বাইরে থেকে সিটকানি আটকিয়ে সামিরা কেন ১/বি ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিলেন?
মৃত্যুর পর অদ্ভুত আচরণ: মৃতদেহ মেঝেতে রেখে সামিরা ও রুবিদের ফ্ল্যাটে বসে আড্ডা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
চুরির স্বীকারোক্তি: এর আগে ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া স্বর্ণ চুরির ঘটনায় কাজের মেয়ের মাধ্যমে পূর্বে একটি চুরির স্বীকারোক্তি পাওয়া গিয়েছিল, যার সাথে এই ঘটনার কোনো সংযোগ আছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শেষ কথা
সালমান শাহর বাবা-মা এবং ঘনিষ্ঠজনদের মতে, এই বিষয়গুলো কোনোভাবেই সাধারণ আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেয় না; বরং এগুলো স্পষ্টতই একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দিকে আঙুল তোলে। আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তাঁর পরিবার ও কোটি ভক্ত।