স্মৃতির ধুলোবালি
লেখক: এম আর সুমন
ভূমিকা:মানুষের জীবন এক বহমান নদী। শৈশবের সেই কলতান ভরা দিনগুলো একসময় সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। অভাব থাকলেও যেখানে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না, সেই সোনারঙা সুখের দিনগুলো আজ কেবলি স্মৃতির ধুলোবালি। সময়ের আবর্তনে, ভুল সিদ্ধান্ত আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একটি সুখী পরিবারের বদলে যাওয়ার গল্প এটি।
স্বর্ণালী অতীত: রহমান সাহেব এবং ফাতেমা বেগমের সংসার ছিল যেন এক টুকরো স্বর্গ। পাঁচ ভাই-বোন—আদিল, তানভীর, সাবিহা, রাইসা এবং জাওয়াদকে নিয়ে তাদের সেই মাটির ঘরটি ছিল মায়ার বাঁধনে বাঁধা। অভাবের সংসারেও বাবা সন্তানদের গান শেখাতেন, মা নিজ হাতে একই থালায় সবাইকে ভাত মেখে খাইয়ে দিতেন। সেই হাসিমুখ আর একতার সুর আজও বড় ছেলে আদিলের কানে বাজে। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার ঠিক আগেই ঘর আলো করে এসেছিল সবার ছোট জাওয়াদ, যেন অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে নতুন আশার আলো।
ভাগ্যের বিবর্তন ও বিচ্ছিন্নতা: সময়ের সাথে সাথে ভাই-বোনেরা বড় হয়, বিয়ে করে আলাদা নীড় বাঁধে। কিন্তু জীবনের নিষ্ঠুরতা শুরু হয় মা ফাতেমা বেগমের প্রয়াণের পর। মায়ের অনুপস্থিতি যেন গোটা পরিবারের ঐক্যের সুতোটি ছিঁড়ে দেয়। রহমান সাহেব বার্ধক্য আর একাকীত্বে নুয়ে পড়েন, সন্তানদের আগের মতো আগলে রাখতে ব্যর্থ হন। বড় ছেলে আদিল এক দুর্ঘটনায় তার পা এবং কর্মক্ষমতা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। বোন সাবিহার সাজানো সংসার ঋণের দায়ে ছারখার হয়ে যায়, তার স্বামী এক বুক কষ্ট নিয়ে ইন্তেকাল করেন। রাইসা নিজের সংসারে মোটামুটি থিতু হলেও সবার দুঃখে সে আজ দিশেহারা। আর সবার ছোট জাওয়াদ আজ অনেকের আশ্রয়স্থল হলেও সেই আগের পারিবারিক সজীবতা আজ আর নেই।
মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতা: একটি পরিবারের ভাঙনের পেছনে কেবল অভাব দায়ী থাকে না; অনেক সময় ব্যক্তিগত অহংকার, ভুল সিদ্ধান্ত এবং চারপাশের মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বড় ভূমিকা রাখে। বিপদে পড়লে আপনজনরা কতটা ছোট চোখে দেখে, সেই অভিজ্ঞতা আদিলকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে। এছাড়া, পরিবারের নতুন সদস্যদের মানসিকতা এবং বাবার সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব অনেক সময় ভাই-বোনের সুসম্পর্ককে বিষিয়ে তোলে। আত্ম-অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়, যার চূড়ান্ত ফলাফল কেবলই শূন্যতা।
উপসংহার: রহমান সাহেবের পরিবারের এই গল্পটি আসলে আমাদের সমাজেরই এক গভীর ক্ষত। যেখানে শৈশবের নিটোল ভালোবাসা বড় হওয়ার সাথে সাথে স্বার্থ আর বাস্তবতার কাছে হেরে যায়। মা হলেন একটি সংসারের কেন্দ্রবিন্দু, তিনি চলে গেলে সংসারটি দিকশূন্য হয়ে পড়ে। আজ সেই পাঁচ ভাই-বোন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, কিন্তু তাদের মনের কোনো এক কোণে আজও জমা হয়ে আছে সেই মাটির ঘরের বারান্দায় একসাথে বসে খাওয়ার অমলিন স্মৃতি। এই উপাখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের একতা ও ভালোবাসা যেকোনো বৈষয়িক সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।মানুষের জীবন এক বহমান নদী। শৈশবের সেই কলতান ভরা দিনগুলো একসময় সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। অভাব থাকলেও যেখানে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না, সেই সোনারঙা সুখের দিনগুলো আজ কেবলি স্মৃতির ধুলোবালি। সময়ের আবর্তনে, ভুল সিদ্ধান্ত আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একটি সুখী পরিবারের বদলে যাওয়ার গল্প এটি।