মোঃ রবিউল ইসলামের জীবনসংগ্রাম: অল্প বেতনে পরিবার চালানোর লড়াই
প্রতিনিধি-: মোঃ শাকিল মাহমুদ
জয়পুরহাট জেলা থেকে জীবিকার তাগিদে রাজধানী ঢাকায় এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করছেন মোঃ রবিউল ইসলাম। পরিবারের চার থেকে পাঁচজন সদস্যের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বর্তমানে সরকারি একটি এটিএম বুথে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
রোদ, বৃষ্টি, শীত কিংবা গভীর রাত—সবকিছু উপেক্ষা করে কর্মস্থলে থাকতে হয় তাঁকে। অথচ মাস শেষে পাওয়া সীমিত বেতন দিয়ে নিজের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ সামলানো অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে।
জয়পুরহাটে থাকা পরিবারের কাছ থেকে দূরে ঢাকায় চাকরি করতে গিয়ে রবিউল ইসলামের জীবনে যুক্ত হয়েছে একাকিত্ব, দায়িত্বের চাপ ও নানা ত্যাগের গল্প। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে নিয়মিত কাজ করে গেলেও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ খুবই সীমিত।
পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট
সিকিউরিটি গার্ডদের অনেকেই কর্মস্থলের কাছাকাছি বা নির্ধারিত জায়গায় অবস্থান করেন। ফলে পরিবার থাকলেও তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়। কোনো পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে ছুটি পাওয়া নিয়েও অনেকের দুশ্চিন্তা থাকে।
মোঃ রবিউল ইসলামের পরিবার জয়পুরহাটে। রাজধানীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবারের চার থেকে পাঁচজন সদস্যের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাঁকে দূরত্বের কষ্টও সহ্য করতে হয়। সন্তানদের বেড়ে ওঠা, পরিবারের আনন্দ কিংবা দুঃখ—সবকিছু কাছ থেকে দেখার সুযোগ অনেক সময় হয়ে ওঠে না।
অল্প বেতনে সংসার চালানোর বাস্তবতা
মাসিক বেতন হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় হিসাব-নিকাশ। ঢাকায় নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ, যাতায়াত এবং পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানো—সব মিলিয়ে সীমিত আয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবারের সবার খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন অনেক সময় পিছিয়ে দিতে হয়। ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা জমাতে চাইলেও মাস শেষে হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না।
এটিএম বুথের নিরাপত্তায় দায়িত্ব
একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গ্রাহকদের নিরাপদে লেনদেনের সুযোগ দেওয়া, বুথের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এসব দায়িত্ব সতর্কতার সঙ্গে পালন করতে হয়।
দিনের পাশাপাশি রাতের সময়ও এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিত থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় সতর্ক থাকার কারণে শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হলেও দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই।
দীর্ঘ ডিউটি ও শারীরিক ক্লান্তি
সিকিউরিটি গার্ডদের দায়িত্ব শুধু একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা নয়। দীর্ঘ সময় সতর্ক থাকা, প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া—সবই তাঁদের কাজের অংশ।
দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা রাতের ডিউটির কারণে শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে কাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। তবুও দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই, কারণ সামান্য অসতর্কতাও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
ছুটি ও পারিবারিক সময়ের সংকট
চাকরিজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছুটি। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের অনেকেই জানান, দায়িত্বের কারণে ছুটি পাওয়া সবসময় সহজ হয় না। একজনের অনুপস্থিতিতে অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হয়—এমন পরিস্থিতিতে ছুটির বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।
ফলে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, ঈদ, সামাজিক আয়োজন কিংবা প্রিয়জনের অসুস্থতার সময়ও অনেককে কর্মস্থলে থাকতে হয়। এতে মানসিক চাপ বাড়ে এবং পরিবার থেকেও দূরত্ব তৈরি হয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
অল্প বেতনে বর্তমান জীবন চালানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের চিন্তাও করতে হয় নিরাপত্তাকর্মীদের। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, বাড়ি নির্মাণ কিংবা অবসরের পরের জীবন—সবকিছুই নির্ভর করে সীমিত আয়ের ওপর।
অনেকেরই ইচ্ছা থাকে নিয়মিত সঞ্চয় করার, কিন্তু মাস শেষে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর হাতে টাকা থাকে না। ফলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্মান ও মানবিক আচরণের প্রত্যাশা
সিকিউরিটি গার্ডরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষা করেন না; তাঁরা ব্যাংক, এটিএম বুথ, হাসপাতাল, মার্কেট, অফিস ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখেন।
তাঁদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়—সময়মতো বেতন, ন্যায্য ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং সম্মানজনক আচরণ। কর্মস্থলে তাঁদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হলে কাজের প্রতি আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ আরও বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
শেষ কথা
জয়পুরহাট থেকে ঢাকায় এসে সরকারি একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তায় দিনরাত দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ রবিউল ইসলাম। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের কষ্টকে আড়াল করে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
তাঁর জীবনসংগ্রাম শুধু একজন নিরাপত্তাকর্মীর গল্প নয়; এটি অল্প আয়ে জীবন চালানো অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যাঁরা অন্যের নিরাপত্তা রক্ষা করেন, তাঁদের নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎও যেন নিরাপদ থাকে—এটাই প্রত্যাশা।