বিশেষ নিবন্ধ • মতামত ও সম্পাদকীয় বিভাগ
মানুষের বাহ্যিক বেশভূষা দেখে তার আসল চরিত্র বা ধার্মিকতা বিচার করা যায় না। প্রথার বেড়াজালে জুব্বা, টুপি আর পাগড়ি পরে খুব সহজেই একজন বাহ্যিক ‘মোল্লা’ সাজা যায়। আবার সাদা কাপড় পরিধান করে একতারা বাজিয়ে বাউল সাজা যায়, কিংবা কপালে তিলক কেটে ব্রাহ্মণ সেজেও বসা যায়। কিন্তু এই বাহ্যিক পোশাক বা রূপসজ্জার নিচে যদি অন্তরটা ঠিক না থাকে, মানুষের প্রতি যদি মায়া-দয়া আর সততা না থাকে—তবে এই মোল্লা বা বাউলের সমাজের চোখে বা স্রষ্টার দরবারে কোনো দাম থাকে না।
পোশাক মানুষকে শুধু ঢাকতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের ভণ্ডামি ঢাকতে পারে না। তাই বাহ্যিক পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে নিজেকে ধার্মিক প্রমাণের চেয়ে অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জন করাটাই সবচেয়ে বড় ইবাদত।
১. বাহ্যিক সাজ বনাম অন্তরের তাকওয়া (কোরআন ও হাদিসের দলিল)
অনেকেই মনে করেন শুধু টুপি, জুব্বা বা বিশেষ পোশাক পরলেই আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যায়। অথচ ইসলাম ধর্মে বাহ্যিক আকৃতির চেয়ে অন্তরের খোদাভীতি বা তাকওয়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
পবিত্র কোরআন:
“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়াই (অন্তরের নিষ্ঠা ও খোদাভীতি)।” — (সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৩৭)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন:
হাদিস শরিফ:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর ও আকৃতির দিকে তাকান না, বরং তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে।” — (সহিহ মুসলিম)
সুতরাং, বাহ্যিক পোশাকে ধার্মিক সাজার চেয়ে অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
২. ইবাদতের নামে লোকদেখানো ভণ্ডামি বর্জন এবং মা-বাপ ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া
পোশাক পরে মসজিদে আজান দিলে ছুটে যাওয়া বা মুখে তাসবিহ জপা হলো ইবাদতের এক অংশ; কিন্তু এর পাশাপাশি সমাজের বাস্তব দায়িত্বগুলো পালন না করলে সেই ইবাদতের কোনো মূল্য থাকে না। অনেকেই জুব্বা-টুপি পরে ধার্মিক সাজেন, অথচ ঘরে থাকা মা-বাপের খবর রাখেন না বা অনাহারী মানুষের খোঁজ নেন না। ইসলামে সৃষ্টির অধিকার রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
পবিত্র কোরআন:
“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।” — (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
হাদিসে ক্ষুধার্ত প্রতিবেশী সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দিয়ে বলা হয়েছে:
হাদিস শরিফ:
“ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।” — (বায়হাকি)
৩. অন্যান্য ধর্মের শিক্ষা: মানবপ্রেম, অহিংসা ও প্রতারণা বর্জন
বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে মানবপ্রেম ও সততার ওপর জোর দিয়েছে। কোনো ধর্মই মানুষকে ঠকানো বা প্রতারণা করার শিক্ষা দেয় না:
সনাতন ধর্ম: সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে—“অহিংসা পরম ধর্মঃ” অর্থাৎ অহিংসা সবচেয়ে বড় ধর্ম। জীবের সেবা করাকেই ঈশ্বরের সেবা হিসেবে গণ্য করা হয়।
বৌদ্ধ ধর্ম: গৌতম বুদ্ধের মূল শিক্ষা ছিল অহিংসা, মৈত্রী ও সব জীবের কল্যাণ কামনা করা।
খ্রিস্টধর্ম: বাইবেলে যিশু খ্রিস্ট বলেছেন—“তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।” আর্তের সেবাই প্রকৃত ধর্মের অঙ্গ।
ইসলাম ধর্ম: ইসলামেও মানুষকে ঠকানো বা প্রতারণা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)
উপসংহার
পরিশেষে বলতে হয়, জুব্বা-টুপি, সাদা কাপড় বা বাহ্যিক বেশে মোল্লা বা বাউল সাজা কোনো কঠিন কাজ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো অন্তরের ভেতরটাকে সৎ রাখা, মানুষকে না ঠকানো, প্রতারণা পরিহার করা, মা-বাপের সেবা করা, ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া এবং সকল ধর্মের প্রতি সম্মান রেখে মানবতার সেবা করা। ভণ্ডামি ও লোকদেখানো পোশাকসর্বস্ব জীবন বাদ দিয়ে যখন মানুষ খাঁটি মনে স্রষ্টার হুকুম মেনে চলবে এবং সৃষ্টিকে ভালোবাসবে, তখনই কেবল মুক্তি ও প্রকৃত শান্তি মিলবে।
ধর্মের লেবাস লাগিয়ে অধর্মের কাজ না করে পোশাক ছাড়াও ধর্মের কাজ করা যায়। তবে অবশ্যই সুন্নতী পোশাককে সম্মান করা সওয়াবের কাজ। পাশাপাশি এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, সুন্নতি পোশাক পরে অপরাধ করাটা আরও অনেক বেশি গুরুতর অপরাধ। অন্তরের সততা ও মানবপ্রেমই হলো ধর্মের মূল ভিত্তি।