শাফায়েত হোসেন
গবেষক, প্রকাশক, লেখক ও সাংবাদিক
‘সত্যের সন্ধানে, মূলধারার এক কলমযোদ্ধা’
সামাজিক ও পেশাগত জীবনের দিকে তাকালে একটি অতি পরিচিত প্রবাদ মনে পড়ে—‘সতীন যেমন আরেক সতীনের দুশমন হয়’, পেশাগত জগতেও কি মানুষ ঠিক তেমনি একে অপরের প্রতিপক্ষ? আপাতদৃষ্টিতে সমাজ ও জীবনের বিভিন্ন স্তরে একই পথ বা একই পেশার মানুষদের মধ্যে এক অদ্ভুত শীতল লড়াই ও দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন তৈরি হয় এবং এর পেছনের মনস্তত্ত্ব কী—তা আজ আমাদের অনুসন্ধানের বিষয়।
সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, মেধাভিত্তিক পেশা থেকে শুরু করে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অঙ্গন—সবখানেই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়া বিদ্যমান। একজন সাংবাদিক যেমন অন্য একজন সাংবাদিকের সাথে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে লিপ্ত হন, তেমনি একজন ডাক্তার বা আইনজীবীও একে অপরের সাথে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই লড়াই কেবল পেশাগত উৎকর্ষের প্রতিযোগিতা নয়, বরং অনেক সময় তা ব্যক্তিগত অহমিকা ও পরিচিতি বৃদ্ধির লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিএনপির বা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তার মূলে থাকে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। একইভাবে ধর্মীয় অঙ্গনে পীর সাহেব, মোল্লা বা হাজী সাহেবদের মধ্যেও কখনো কখনো নিজের প্রভাববলয় ধরে রাখার অঘোষিত লড়াই আমাদের চোখে পড়ে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট। খাবারের হোটেলের মালিক হোক কিংবা স্বর্ণ ব্যবসায়ী—বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাহক টানার ইঁদুর দৌড়ে তারা একে অপরের প্রতিযোগী। এমনকি প্রান্তিক পর্যায়ের পেশাজীবী যেমন রিকশাচালক কিংবা অন্ধকার জগতের মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও অপরাধীদের মধ্যেও বেঁচে থাকার লড়াই বা অপরাধ সাম্রাজ্যের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তৈরি হয় রক্তক্ষয়ী শত্রুতা। দার্শনিকের জগতে দ্বন্দ্বের রূপটা ভিন্ন; সেখানে দ্বন্দ্ব অস্ত্রের নয়, বরং মতাদর্শের। তবুও সব ক্ষেত্রেই মূল জায়গাটি এক—নিজের জায়গাটা অন্য কাউকে ছেড়ে না দেওয়া।
কিন্তু এই দ্বন্দ্বের মুদ্রার অপর পিঠও আছে। অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ কেবল প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের পরম বন্ধু ও শক্তিও। যখন কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠী তাদের অধিকার আদায়ের কথা বলে, তখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বীরাই আবার একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ায়। কোনো ব্যবসায়ীর বড় ক্ষতিতে অন্য ব্যবসায়ীর সহমর্মিতা, কিংবা সহকর্মীর বিপদে অন্য সহকর্মীর সহযোগিতার চিত্র আমাদের সমাজে বিরল নয়।
মূলত, মানুষ যখন একই ক্ষেত্র, একই লক্ষ্য বা একই অবস্থানের মধ্যে কাজ করে, তখন সীমিত সুযোগ ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা থেকেই দ্বন্দ্বের জন্ম হয়। আবার যখন বড় কোনো উদ্দেশ্য সামনে আসে, তখন এই দ্বন্দ্বই রূপান্তরিত হয় যৌথ শক্তিতে। সুতরাং, ‘সতীন’ বা প্রতিপক্ষের এই সম্পর্কটি সবসময় ধ্বংসাত্মক নয়; বরং অনেক সময় তা আত্মোন্নয়নের একটি তাড়নাও বটে। দিনশেষে, জীবনের পথ চলায় আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করি এবং সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে সমাজকে এগিয়ে নিই। এটাই জীবন, এটাই বাস্তবতা।