সুবর্ণ বিশ্বাস,ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি।
সারাদেশে আমন মৌসুম রোপণের শুরুতেই দেখা দিয়েছে তীব্র সার ও কীটনাশকের সংকট। কাঙ্ক্ষিত সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়া এবং বাজারে কীটনাশকের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের কৃষকেরা। ডিলারদের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না চাহিদা মতো সার। ফলে ফসলের ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় কৃষকের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
সংকটের চিত্র ও সরেজমিন পরিস্থিতি
দেশের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলো ঘুরে জানা গেছে, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সহ প্রধান প্রধান সারের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। সরকারি মূল্যে সার বিক্রির কথা থাকলেও অধিকাংশ জায়গায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।
অনিয়ম ও কৃত্রিম সংকট: অভিযোগ উঠেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলার চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
কীটনাশকের বেপরোয়া দাম: সারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশকের দামও এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নকল ও নিম্নমানের কীটনাশকে বাজার সয়লাব হওয়ায় ফসল রক্ষার বদলে উল্টো ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা।
খুচরা বাজারে দুর্ভোগ: খোলা বাজারে প্রয়োজনীয় কীটনাশক কিংবা সার পাওয়া গেলেও তা সাধারণ কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
কৃষকদের দুর্ভোগ ও মতামত
কৃষকরা জানান, সেচ ও সার দেওয়ার সঠিক সময় পার হয়ে গেলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। রংপুর অঞ্চলের কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “জমিতে এখন সার দেওয়া খুব জরুরি, কিন্তু ডিলারের কাছে গেলে বলছেন সার নেই। আর বাইরের দোকান থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ফসল ফলিয়ে আমাদের মূল টাকাই উঠবে না।”
ঝিনাইদহের এক সবজি চাষি জানান, “কীটনাশকের দাম এত বেড়েছে যে পোকা দমনে ওষুধ স্প্রে করতে গিয়ে খরচের বাজেট পার হয়ে যাচ্ছে। আবার দাম বেশি দিয়েও আসল ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না।”
সংকটের মূল কারণসমূহ
১. সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যত্যয়: আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন জটিলতার কারণে সার আমদানিতে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি হওয়া।
২. অসাধু চক্রের সিন্ডিকেট: স্থানীয় পর্যায়ে সার ও কীটনাশকের অবৈধ মজুদ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে বিক্রি।
৩. নজরদারির অভাব: স্থানীয় বাজারগুলোতে যথাযথ মনিটরিং বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত নজরদারি না থাকা।
সমাধানের সুপারিশ ও আশু করণীয়
নিয়মিত বাজার মনিটরিং: উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে খোলা বাজারে ও ডিলারদের কাছে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা।
সরকারি সরবরাহ বৃদ্ধি: বিএডিসি ও বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে সরাসরি সরকারি মূল্যে সার ও মানসম্মত কীটনাশক বিতরণ জোরদার করা।
সহজ শর্তে কৃষি ঋণ: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে দ্রুত প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা প্রদান।
অভিযোগ কেন্দ্র গঠন: কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত দাম নিলে যেন কৃষকরা সহজে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য হটলাইন বা অভিযোগ কেন্দ্র চালু করা।
কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। সময়মতো সঠিক দামে সার ও কীটনাশক না পেলে সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষক ও কৃষি বাঁচাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার ও কীটনাশকের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।