আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কার্যক্রম বিশ্বমঞ্চে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের জোরালো অবস্থান ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই এক সপ্তাহের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ দেশ ও দেশের বাইরে মার্কিন প্রশাসনের সামনে থাকা জটিল সংকটগুলো মোকাবিলায় খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি।
বর্তমানে হোয়াইট হাউসের সামনে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘায়িত ইরান সংঘাত। এর নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি খোদ মার্কিন মুলুকেও জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী, যা সরাসরি আঘাত হানছে ট্রাম্পের জনসমর্থনে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে চীনের সঙ্গে তীব্র হতে থাকা প্রতিযোগিতা মার্কিন প্রশাসনের মাথাব্যথা বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘের মঞ্চে কঠোর অবস্থান ও চীন প্রসঙ্গ
গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান যে, বৈশ্বিক নিয়মনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্র একচুলও পিছপা হচ্ছে না। যুদ্ধোত্তর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক সংস্থায় দাঁড়িয়ে তিনি তেহরানকে নতুন করে হুঁশিয়ারি দেন এবং ওপেকের সদস্য ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা উচ্চারণ করেন। আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে শক্তিপ্রয়োগের নীতি থেকেও তিনি সরে আসেননি।
তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে। অতীতে চড়া শুল্ক ও কঠোর বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অবস্থান নিলেও, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কৌশল বদলাতে বাধ্য হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি ‘বিরল খনিজ’ (Rare Earths) উপাদানের ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ সীমিত করার সক্ষমতা ট্রাম্পের পুরনো কৌশলকে অনেকটাই অকার্যকর করে দিয়েছে। ফলে সি-ট্রাম্প বৈঠকে তাইওয়ান বা বাণিজ্য ইস্যুর মতো জটিল বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতি ছাড়াই কেবল দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ দুই মাস বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
ইরান সংকট ও মিত্রদের দূরত্ব
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও তেহরান পিছু হটেনি। উল্টো এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপ ও এশিয়ার বহু মিত্রদেশ ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার মতো বিশ্বনেতারা সরাসরি নাম উচ্চারণ না করলেও বৈশ্বিক রাজনীতিতে শক্তিপ্রয়োগ ও জবরদস্তির প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপে অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ না করে জোরালোভাবে ‘না’ বলার সাহস দেখাতে শুরু করেছে। গ্রিনল্যান্ড দখল বা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের মধ্যস্থতার মতো নানা উদ্যোগেও ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ার বিষয়টি তারই ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এসব সমালোচনা নাকচ করে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে আগামী নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায়, রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে—এমন রাজনৈতিক সমীকরণ ট্রাম্পের আগামী দিনের নীতি নির্ধারণী পরিসরকে আরও সংকুচিত করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।