মোঃ রানা
উপজেল প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ সদর
দশ বছর আগে এক শুভ লগ্নে আশফাকুর রহমানের হাত ধরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন নিগার সুলতানা লিজা। পরিবারের আশীর্বাদে গড়া সেই সংসারে ছিল সুখ, ভালোবাসা আর পারস্পরিক সম্মানের বন্ধন। সময়ের সঙ্গে তাদের ঘরে আসে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান যেন জীবনের পূর্ণতা। কিন্তু সেই সুখের সংসারে পুত্র সন্তান জন্মের পর হতেই অদৃশ্যভাবে ফাটল ধরতে শুরু করে।
আশফাক একজন সম্মানজনক পদের
সরকারি চাকুরীজীবি।
সরকারি চাকুরীজীবি এই মানুষটির ভেতরে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত দাম্ভিকতা, অহংকার যেন তার নতুন পোশাক হয়ে ওঠে। অপরদিকে, নিগার সুলতানা ছিলেন পর্দানশীন, শান্ত, এক গৃহবধূ। সংসারে নীরবতা ভালোবাসতেন, কিন্তু তার সেই নীরবতাকেই হয়তো দুর্বলতা ভেবে নিয়েছিল তার স্বামী আশফাক।
একসময় আশফাকের মন অন্য পথে চলে যায়। সে তার পর্শীল স্ত্রী কে অবহেলা করে নেশা ও পর নারীতে আসক্ত হয়ে পড়ে। তাকে টেনে নেয় এক অন্ধকার জগতে। সংসার সন্তান, ভালোবাসা, দায়িত্ব সব কিছু পিছনে ফেলে দিয়ে রাত গভীরে নেশায় চুর হয়ে ফিরতেন আশফাক। সে যখন নেশায় চুর হয়ে ঘরে ফিরতেন তখনই ঘরে চলত চিৎকার,গালাগালি, আবার কখনো বা শারীরিক নির্যাতন। লিজা তবুও
সংসার সম্পর্ক আর সন্তানদের কথা চিন্তা করে চুপ থাকতেন আর ধৈর্য ধরে সকল অত্যাচার সহ্য করতেন ভাবতেন একদিন বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু না কোন পরিবর্তনও নেই। অত্যাচার যেন আরও কয়েক গুন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সহ্য ধৈর্যেরও তো সীমা আছে। নেশাগ্রস্থ পরনারীতে আসক্ত স্বামীর অত্যাচার ও অপমানের আগুনে প্রতিদিন দগ্ধ হচ্ছিল লিজা। তবুও তিনি চেষ্টা করেছেন স্বামীকে ফেরাতে কখনো ভালোবেসে, কখনো কেঁদে, কখনো সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বলে। কিন্তু আশফাকের চোখে তখন কেবল অন্ধকার।
শেষ পর্যন্ত এই বছরের জুলাই মাসে, ক্লান্ত লিজা আদালতের দ্বারস্থ হন। তিনি আর সংসারে ফিরবেন না এই সিদ্ধান্ত নেন চোখের জলে বুক ভিজিয়ে। মামলা হয়, আদালতও সাক্ষী হয় একটি ভাঙা সম্পর্কের পরিসমাপ্তির। আশফাক নিজেও জানিয়ে দেন তিনি আর সংসার করবেন না।
আদালত নির্দেশ দেন, গৃহবধূ লিজার পিতা সংসারে যা দিয়েছিলেন, তা ফিরিয়ে দিতে হবে। আদালতের প্রাঙ্গণে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হয় সবাই, ছেড়া জাজিম, খাট, হাড়িপাতিল, থালাবাসন, বাক্স, এমনকি একটি পুরনো সুপারসেট সব মাটিতে পড়ে আছে। ধুলায় মিশে যাওয়া ভালোবাসার নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে।
যে জিনিসগুলো একসময় সুখের সংসারে প্রাণের ছোঁয়া পেয়েছিল, আজ সেগুলো নিঃসঙ্গ পড়ে আছে আদালতের কোণে। উৎসুক জনতা থমকে দাঁড়ায়। কেউ বলে এই তো জীবনের গল্প-সবই যেন মরিচিকা।
দুটি সন্তানের মধ্যে পুত্রকে জোর করে রেখে দেয় আশফাকের কাছে, আর কন্যাটি লিজার কোলে ফিরে আসে। মায়ের বুকের কান্না থামে না। ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
পড়ন্ত বিকেলের দিকে মিনি ট্রাকের হর্ণ বাজে। সেই ট্রাকেই তুলে নেওয়া হয় লিজার তিল তিল করে গড়া সংসারের স্মৃতি। খাটের জাজিমে লেগে থাকা হাসির গন্ধ, পুতুল খেলার দিনগুলোর ছায়া, আর রান্নাঘরের সেই গ্যাস চুলা সব একে একে চলে যায় তার জীবন থেকে।
মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখে। লিজা চোখের পানি মুছে একবার পেছনে তাকান যেখানে একসময় ছিল স্বপ্ন, ভালোবাসা, আর একটা পূর্ণ সংসার। আজ সেখানে কেবল ধুলো উড়ছে।
হয়তো সেই ধুলোর ভেতরেই হারিয়ে গেছে একটা সংসারের গল্প। একটা নারীর সহ্যের সীমা। একটা ভাঙা হৃদয়ের কান্না। আর একটি সত্য “সংসার যদি মায়া হয়, তবে ভালোবাসার মৃ/ত্যুই তার সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা।
বি:দ্র: সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনায় উভয়ের পুর্নাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরা হয়নি।