ঢাকা   ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ । ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
পতেঙ্গায় কোস্ট গার্ডের পৃথক অভিযানে চোরাই মালামাল উদ্ধার, আটক ২ চুয়াডাঙ্গার গৌরব: প্রথম বিজিবি অফিসার হিসেবে কমিশন পেলেন বেগমপুরের রাকিবুল ইসলাম রাজশাহী তানোর চোর চক্র সদস্য আটক অনলাইন জগত: আস্থার সংকট বনাম অফুরন্ত সম্ভাবনা বাঘাইছড়িতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন জকিগঞ্জের সেবামুখী প্রশাসনের প্রতীক ইউএনও মাসুদুর রহমানের বদলি সেতু নির্মাণকাজে ভোগান্তি, শুকনো নদীতে নৌকা নির্ভর যাতায়াত। জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কক্সবাজার জেলা সভাপতির সঙ্গে টেকনাফ উপজেলা কমিটির সৌজন্য সাক্ষাৎ সারিয়াকান্দিতে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনায় ব্যবসায়ী গ্রেফতার দুই বেকারত্ব: এক নীরব মহামারীর আখ্যান ও কাঠামোগত সংকট

বেকারত্ব: এক নীরব মহামারীর আখ্যান ও কাঠামোগত সংকট

okmedia56@gmail.com
  • প্রকাশিত : রবিবার, জুন ১৪, ২০২৬
  • 7 শেয়ার

হাকিমুল উম্মা

 

​১৯০০-এর দশকের মহামন্দার প্রেক্ষাপটে নোবেলজয়ী লেখক জন স্টেইনবেক তাঁর ‘দ্য গ্রেপস অব র‍্যাথ’ উপন্যাসে কর্মহীন মানুষের যে অসহায়ত্ব ও দ্রোহের চিত্র এঁকেছেন, তা আজও বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এক ধ্রুব দলিল হয়ে আছে। মানুষের কর্মের মাঝে সার্থকতা খোঁজার আদিম প্রবণতা যখন বেকারত্বের করাল গ্রাসে থমকে দাঁড়ায়, তখন ব্যক্তি কেবল জীবিকাহীনই হয় না, বরং সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের দারিদ্র্য থেকে শুরু করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা সমরেশ মজুমদারের উপন্যাসে ফুটে ওঠা বাংলার বেকার যুবসমাজের যে ক্ষোভ, তা প্রকারান্তরে আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থারই এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিচ্ছবি। সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বা ‘জনঅরণ্য’ সিনেমায় ইন্টারভিউ বোর্ডের অপমান এবং সমকালীন কবিদের কবিতায় যে ‘ভবিষ্যতের শূন্যতা’র হাহাকার, তা আজকের আধুনিক বাংলাদেশেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বেকারত্ব কেবল ক্যারিয়ার ধ্বংস করে না, এটি কেড়ে নেয় মানুষের ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও ভালোবাসার মানুষটিকেও; যেমনটি ফুটে উঠেছে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায়, যেখানে চাকরিপ্রার্থী যুবকের পকেটে সার্টিফিকেট আর বুকে জমা থাকে এক সমুদ্র হাহাকার। পরিসংখ্যানের শুষ্ক কাগজের আড়ালে লুকিয়ে থাকে লাখো তরুণের স্বপ্নভঙ্গের গল্প, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ‘টাইম বোম’। বিশ্বব্যাংক ও আইএলও-এর তথ্য বলছে, একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর, অন্যদিকে প্রতিবছর বিশাল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছে। শিক্ষা ও দক্ষতার এই ‘মিসম্যাচ’ বা অসামঞ্জস্যের ফলে তৈরি হচ্ছে ‘এলিট আনএমপ্লয়মেন্ট’, যেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা অদক্ষ শ্রমিকের চেয়েও করুণ অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। কেবল শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, বরং কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন ব্যতীত সার্টিফিকেট বিতরণ তরুণদের হাতে তলোয়ার তুলে দেওয়ার মতো, যা রাষ্ট্রকে ক্রমাগত এক অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিহাসে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে ড. ভবতোষ দত্ত কিংবা বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলীর মতো গুণীজনদেরও একসময় ভয়াবহ বেকারত্বের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু তারা হাল ছাড়েননি। সংকটময় এই সময়ে ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের ‘ট্রান্সফারড অ্যাগ্রেশন’ বা স্থানান্তরিত ক্রোধের তত্ত্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যখন রাষ্ট্র কর্মসংস্থান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষের জমানো ক্ষোভ সমাজের নিরীহ বা দুর্বল অংশের ওপর আছড়ে পড়ে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক ভাঙনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে ‘নেসেসিটি এন্টারপ্রেনারশিপ’ বা অনন্যোপায় উদ্যোক্তা হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তবে সবাই উদ্যোক্তা হতে পারেন না, তাই রাষ্ট্রকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দিকে আরও জোরালো নজর দিতে হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাহিদাকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের মাধ্যমে তরুণদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, বেকারত্ব কোনো অলসতার ফসল নয়, বরং এটি মেধার অপচয় এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার দেউলিয়াত্ব। যদি আমরা এই বিশাল যুবশক্তিকে সঠিক কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে না পারি, তবে দেশের উন্নয়ন কেবল কিছু পরিসংখ্যানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। এখনই সময় সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিন্যাস করার, যাতে তরুণরা তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারে এবং দেশও তাদের মেধা ও শ্রমে সমৃদ্ধ হতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ

© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৪