শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা।
সঠিক খাতে ঋণ ব্যবহার, শতভাগ সঞ্চয় ও নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে অনন্য দৃষ্টান্ত
একসময় আর্থিক সংকট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। জীবিকা নির্বাহে নির্ভর করতে হতো সীমিত আয় ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের ওপর। সেই বাস্তবতা বদলাতে ঋণকে কাজে লাগিয়েছেন গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির সদস্যরা। কেউ মাছ চাষ করছেন, কেউ জাল তৈরি করছেন, কেউ গড়ে তুলেছেন গবাদিপশু বা পোল্ট্রি খামার। কেউ আবার মাছের ব্যবসা, মুদি দোকান কিংবা ইজিবাইক চালিয়ে বাড়িয়েছেন আয়। এ সমিতি ২৫-৩০ জন মৎস্যজীবী সাগর ও সুন্দরবনে মাছ ধরতে যায় । সঠিক খাতে ঋণের ব্যবহার, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ ও শতভাগ সঞ্চয়ের কারণে এখন সাফল্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছে সমিতিটি। নিয়মিত তদারকি, সঠিক দিকনির্দেশনা ও ঋণ ব্যবহারে নজরদারির ফলে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন মৎস্যজীবীরা। উপজেলা মৎস্য অফিসের মনিটরিং ও পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার করছেন সদস্যরা।
সারা দেশে প্রায় ৪৫০টি গ্রাম সমিতির মধ্যে গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতি বর্তমানে শীর্ষ সমিতিগুলোর একটি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সমিতির সদস্যদের আর্থিক কর্মকাণ্ড, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, নজরদারী এবং দায়িত্বশীলতাই এ অবস্থানের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।
বর্তমানে সমিতিটির সদস্য সংখ্যা ৮৫ জন। সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সদস্যরা বিভিন্ন খাতে ঋণ নিয়ে নিজেদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। খাতভিত্তিক হিসাবে মাছ চাষে ২০ জন, গাভী পালনে ২০ জন, মাছের ব্যবসায় ০৫ জন, ক্ষুদ্র ব্যবসায় ৬ জন, মুদি দোকানে ৩ জন, ভ্যান ও ইজিবাইকে ১৮ জন, জাল তৈরিতে ০৭ জন এবং হাঁস-মুরগি পালনে ০৭ জন ঋণ নিয়েছেন।
ঋণ নিয়ে শুধু ব্যবসা শুরু করাই নয়, অনেকে সেই অর্থ দিয়ে নিজেদের জীবিকার পরিধিও বাড়িয়েছেন। জাল তৈরির জন্য স্বপন বিশ্বাস নিয়েছেন ৮০ হাজার টাকা। মাছ চাষের জন্য আকরাম সরকার নিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা। মঞ্জু রানি সরকার গাভী পালনের জন্য, মিলন সরকার পোল্ট্রি খামারের জন্য এবং বিপ্লব বিশ্বাস ইজিবাইক কেনার জন্য ঋণ নিয়েছেন। জাল তৈরির কাজে ঋণ নিয়েছেন কল্পনা বিশ্বাস, রূপালী বিশ্বাস, মীরা বিশ্বাস, আন্না রানি বিশ্বাস, অনিমা ও কৃষ্ণা সরকারসহ আরও কয়েকজন। প্রশান্ত সরকার, চিত্ত সররকার, বিশ্বজিৎ সরকার- আগে সাগরে যেত এখন যায়না, আগে দাদন নিয়ে যেত। এখন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে প্রশান্ত সরকার মাছ চাষ করে, গাভী পালন করে মাঝে মাঝে ভ্যানও চালায়। চিত্ত সরকার জাল বুনে জাল ভাড়া দেয় ও ঘেরে জাল টানে। বিশ্বজিৎ সরকার ভ্যান চালায় ও ঘেরে জাল টানে।
মাছ চাষেও ঋণের অর্থ ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছেন সদস্যরা। মাধব বিশ্বাস, আকরাম সরদার, সাধন সরকার ও শিবপদ বিশ্বাস প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়েছেন।
ডুমুরিয়া উপজেলা ফিশারিজ ফেডারেশনের কোঅর্ডিনেটর কাকলী বিশ্বাস বলেন, গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির কার্যক্রম খুবই ভালো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫০টি গ্রাম সমিতির মধ্যে এ সমিতি শীর্ষ পাঁচের মধ্যে রয়েছে। সদস্যরা যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেন, সেই কাজেই ঋণের অর্থ ব্যবহার করেন। পাশাপাশি সমিতির কমিটিগুলোও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে।
কাকলী বিশ্বাস আরও বলেন, উপজেলা মৎস্য অফিসের মনিটরিং ও সঠিক দিকনির্দেশনার ফলে সদস্যরা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন এবং সমিতির সঞ্চয়ের হার ১০০ শতাংশ। প্রতি মাসের কিস্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় সমিতিটির কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে।
গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির সভাপতি প্রশান্ত সরকারের পক্ষে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন তাঁর প্রতিনিধি অঞ্জনা সরকার। তিনি জানান, সমিতিতে ৮৫ জন সদস্য থাকলেও বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো বকেয়া নেই।
নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন অঞ্জনা সরকার। তাঁর ৫০ শতকের একটি ঘের রয়েছে। তিনি সমিতি থেকে দুই দফায় ঋণ নিয়েছেন—প্রথমবার ৪০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয়বার ৫০ হাজার টাকা। ঋণের অর্থ মাছ চাষের কাজে ব্যবহার করে তিনি নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখছেন।
সমিতির বর্তমান সাফল্যের পেছনে বর্তমান মৎস্য অফিসের ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন আমাদের মৎস্য অফিসার স্যার নিয়মিত খোজখবর নেন ও তদারকী করেন। নিয়মিত মাসিক ও ত্রৈমাসিক মিটিং হচ্ছে কিনা দেখা হলেই জানতে চান। অফিসে গেলে টাকা জমা স্লিপ ও আদায় শীট মিলিয়ে দেখেন। কোন সমিতিতে টাকা বকেয়া পড়লে আদায়ের বিষয়ে তৎপর হবার তাগিদ দেন এবং যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেয়ার পরামর্শ দেন।
এছাড়া, সাবেক এসডিএফ কর্মকর্তাবৃন্দ, মৎস্য অফিসের পলাশ কুমার সেন-অর্চন বসু এবং সমিতির সদস্যদের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন অঞ্জনা সরকার। তিনি সাধনা, কবিতা, বাসন্তী, সুমিত্রা, সুকুমার ও গোবিন্দসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন।
ডুমুরিয়া মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী পলাশ কুমার সেন বলেন, গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির সদস্যরা ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহার করছেন এবং নিয়মিত কিস্তি ও সঞ্চয় জমা দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে ঋণের সঠিক ব্যবহার ও সদস্যদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ঋণের সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত সঞ্চয় ও সময়মতো কিস্তি পরিশোধের কারণে সমিতিটির কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে।
উপজেলা ফিশারিজ ফেডারেশনের সভাপতি কমলা বিশ্বাস বলেন, সদস্যরা যে উদ্দেশ্যে ঋণ নিচ্ছেন, সেই কাজেই অর্থ ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছেন এবং সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। সমিতির কমিটিগুলোও নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, মৎস্য অফিসের নিয়মিত মনিটরিং ও পরামর্শের মাধ্যমে সমিতিগুলোর কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হচ্ছে। কোনো সদস্য বা সমিতির ঋণ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ঋণ বিতরণের আগে সদস্যদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা যাচাই এবং ঋণ নেওয়ার পর তা সঠিক খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না, উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নজরদারিতে রাখতে হবে বলে কমলা বিশ্বাস মত দেন। তাঁর মতে, এভাবে সমিতিগুলো পরিচালিত হলে মৎস্যজীবী পরিবারের আয় ও জীবনমান উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, মৎস্যজীবীদের স্বাবলম্বী করতে গ্রাম সমিতির কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। ঋণ যেন নির্ধারিত খাতে ব্যবহৃত হয় এবং কিস্তি ও সঞ্চয় নিয়মিত জমা হয়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণ দেওয়ার আগে প্রয়োজন ও সক্ষমতা যাচাই এবং বকেয়া আদায়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গোনালী আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম সমিতির গল্প তাই কেবল ঋণ নেওয়া ও পরিশোধের গল্প নয়; এটি নজরদারী, লীডারশীপ, সঞ্চয়, দায়িত্বশীলতা এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর একটি উদাহরণ। সদস্যদের ভাষ্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঋণের অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহার এবং নিয়মিত তত্ত্বাবধানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে মৎস্যজীবী পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের সমিতি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।