নিজস্ব প্রতিবেদকঃ-
সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় অঙ্গনে ‘মুফতি’, ‘শাইখুল হাদিস’ বা ‘কাসেমী’র মতো ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ উপাধিগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার এবং এগুলোর সপক্ষে দালিলিক প্রমাণের অনুপস্থিতি জনপরিসরে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। কওমি বা ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক শিক্ষাব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার পরেই কেবল এই উপাধিগুলো অর্জনের বিধান রয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার স্পষ্ট প্রমাণের ঘাটতি থাকলে তা সাধারণ মানুষের মনে যেমন বিভ্রান্তি তৈরি করে, তেমনি সামগ্রিক শৃঙ্খলাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমাজে বিদ্যমান গভীর আদর্শিক মেরুকরণ এবং আস্থার সংকট। জনপ্রিয় ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘিরে এক পক্ষে যেমন অন্ধ অনুসারীদের কট্টর অবস্থান দেখা যায়, তেমনি অন্য পক্ষে থাকেন কঠোর সমালোচকরা। কোনো অভিযোগ বা বিরোধ সামনে এলে অনুসারীরা তাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরিত্রহনন’ বলে উড়িয়ে দেন, আর সমালোচকরা যোগ্যতার ঘাটতিকে বড় করে তোলেন। ফলে এই আলোচনাগুলো আর কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা দল ও উপদলের মধ্যকার বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে অতীত জীবন বা সার্টিফিকেটের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এ ছাড়াও, বহু দশকের পুরোনো শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড বা দালিলিক প্রমাণ সাধারণ মানুষের পক্ষে সবসময় যাচাই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তথ্যের এই ঘাটতি ও স্বচ্ছতার অভাবকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের অনুকূলে বয়ান তৈরি করে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ও গুঞ্জন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং মানুষের মধ্যকার দূরত্বকে কেবল ত্বরান্বিতই করে।
পরিশেষে বলা যায়, ধর্মীয় উপাধিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত এই বিতর্কগুলো কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত যোগ্যতার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সমাজে প্রমাণের সংস্কৃতির অভাব, আস্থার সংকট এবং মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতারই একটি গভীর বহুল প্রচলিত বহিঃপ্রকাশ। এই সংকট উত্তরণে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং তথ্য যাচাইয়ের সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ।