পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি: মোঃ আশরাফুল ইসলাম
বৃদ্ধ বয়সে যখন স্বস্তি ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা, তখনই নিজের সম্পত্তি নিয়ে আইনি জটিলতা ও হয়রানির অভিযোগে রাস্তায় নামতে হয়েছে পঞ্চগড়ের এক বৃদ্ধ দম্পতিকে। জামাতার বিরুদ্ধে জমি দখলের চেষ্টা, জমি বিক্রিতে বাধা এবং হয়রানির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেছেন তারা।
রোববার দুপুরে পঞ্চগড় আদালতের সামনে মহাসড়কের পাশে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভুক্তভোগী দম্পতি খায়রুল আলম ও তার স্ত্রী মমতাজ জাহান, তাদের দুই মেয়ে ডা. নাফিয়া ইয়াসমিন ও নাঈমা ইয়াসমিন এবং স্বজন এ এস এম মোস্তফা সারওয়ার বাবুসহ এলাকার লোকজন অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, পঞ্চগড় জেলা শহরের মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা খায়রুল আলম সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর নেন। চার মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে নাসিমা ইয়াসমিনকে ১৯৯৮ সালে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন পঞ্চগড়ের আইনজীবী হাসান সারওয়ার হেনরি। দীর্ঘদিন এ সম্পর্ক মেনে না নিলেও ২০০৮ সালের পর পরিবার থেকে তা মেনে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি করে মামলা দায়েরসহ নানা কৌশলে শ্বশুর-শাশুড়িকে হয়রানি করা হয়েছে। মামলার অজুহাতে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ারও অভিযোগ করেন তারা।
মানববন্ধনে বলা হয়, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সম্প্রতি খায়রুল আলম ও তার স্ত্রী মমতাজ জাহান পঞ্চগড়ের কায়েতপাড়া এলাকায় নিজেদের মালিকানাধীন ৪৪ শতাংশ জমি বায়নামা রেজিস্ট্রি করে বিক্রির উদ্যোগ নেন। অভিযোগ, এ সময় আইনজীবী হাসান সারওয়ার হেনরি ওই জমি বিক্রিতে বাধা দেন। ভুয়া ওয়ারিশ দেখিয়ে জমিটি নিয়ে হয়রানিমূলক মামলা করা হয় এবং আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশও নেওয়া হয়। পাশাপাশি জমির দাখিলা না দেওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের কাছেও অভিযোগ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
ফলে জমি বিক্রি করতে না পারায় চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন বৃদ্ধ দম্পতি। শেষ বয়সে চিকিৎসার অর্থের জন্য নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি করতে গিয়েও বাধার মুখে পড়ায় ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব থেকেই তারা রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন বলে জানান।
মানববন্ধন শেষে আইনজীবী সমিতির কাছেও অ্যাডভোকেট হাসান সারওয়ার হেনরির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
এদিকে হাসান সারওয়ার হেনরির বিরুদ্ধে তার ভাই এ এস এম মোস্তফা সারওয়ার বাবুও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, “হেনরি আমার প্রয়াত মাকে চড় মেরেছিল। মাকে নির্যাতন করে ছয় শতক জমিসহ বাড়ি লিখে নেয়। আমার বিরুদ্ধেও সে হয়রানিমূলক মামলা করেছে।”
ভুক্তভোগী খায়রুল আলম বলেন, “হেনরি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করছে। বৃদ্ধ বয়সে চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করতে চাইলেও ভুয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে মামলা করে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। আমার সম্পত্তি দখলেরও চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তার দুই মেয়ে নাঈমা ইয়াসমিন ও ডা. নাফিয়া ইয়াসমিন অভিযোগ করেন, “আমাদের বাবার সম্পত্তি আত্মসাতের একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শেষ বয়সে বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করতেও নানা ধরনের বাধা ও ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অ্যাডভোকেট হাসান সারওয়ার হেনরি। তিনি বলেন, “আমাকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।”
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র যাচাই করে আইনগত অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বৃদ্ধ দম্পতির দাবি, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা কারও সম্পত্তি দখল করতে চান না; বরং নিজেদের সম্পত্তির অধিকার ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করতে চান।