সুবর্ণ বিশ্বাস,ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি:
“সচেতনতা বাড়াই, জীবন বাঁচাই”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবং প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক রোগ নির্মূলে সামাজিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ঝিনাইদহে পালিত হয়েছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। এ উপলক্ষে আজ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ঝিনাইদহের আয়োজনে হাসপাতালের মিলনায়তনে এক বিশেষ সচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের দিবসের মূল অঙ্গীকার হলো— “Stronger Together: একসাথে, আরও শক্তিশালী – জলাতঙ্ক মুক্ত বিশ্ব গড়ি”।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিনিয়র চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় জলাতঙ্ক রোগের ভয়াবহতা, প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভায় বক্তারা বলেন, জলাতঙ্ক একটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী রোগ হলেও এটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। কেবল সঠিক সময়ে সঠিক সচেতনতা ও প্রাথমিক পদক্ষেপই পারে একটি অমূল্য জীবন রক্ষা করতে।
জলাতঙ্ক রোগের কারণ ও গুরুত্ব
আলোচনা সভায় বক্তারা জানান, জলাতঙ্ক মূলত একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত সংক্রামিত কুকুর, বিড়াল, শিয়াল বা বেজির কামড় অথবা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রামিত প্রাণীর লালা থেকে এই ভাইরাস ক্ষতের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। একবার রোগের লক্ষণ (যেমন: পানির প্রতি তীব্র ভয় বা হাইড্রোফোবিয়া, আলো ও বাতাসের প্রতি অতি সংবেদনশীলতা) প্রকাশ পেলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। তাই লক্ষণ প্রকাশের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কামড় বা আঁচড় পরবর্তী জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা
চিকিৎসকমণ্ডলী আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষার্থে কামড় বা আঁচড়ের পর তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে কয়েকটি মূল দিক নির্দেশনা দেন:
ক্ষতস্থান ধৌতকরণ: প্রাণী কামড় বা আঁচড় দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আক্রান্ত স্থানটি কোনো ক্ষারযুক্ত সাবান এবং প্রবাহমান পরিষ্কার পানি দিয়ে টানা ১৫ থেকে ২০ মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে ক্ষতস্থানে থাকা ভাইরাসের ঘনত্ব অনেকটাই কমে যায়।
কুসংস্কার রোধ: ঝাড়ফুঁক, কবিরাজি চিকিৎসা, বাঁধন দেওয়া বা ক্ষতস্থানে অচেনা কোনো পদার্থ লাগানোর মতো কুসংস্কার সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।
দ্রুত হাসপাতালে গমন: প্রাথমিক চিকিৎসার পরপরই রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা (Vaccine) ও প্রয়োজনবোধে ইমিউনোগ্লোবুলিন গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও সামাজিক দায়িত্ব
সভায় বক্তারা সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেন। তাঁরা জানান, জলাতঙ্ক মুক্ত সমাজ গঠনে সাধারণ মানুষের করণীয়:
১. পোষা প্রাণীর টিকাদান: বাড়িতে থাকা পোষা কুকুর বা বিড়ালকে সময়মতো জলাতঙ্কবিরোধী টিকা প্রদান নিশ্চিত করা।
২. বেওয়ারিশ প্রাণীর ব্যবস্থাপনা: স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বয়ে বেওয়ারিশ কুকুরদের জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদানের আওতায় আনা।
৩. অন্যদের সচেতন করা: কামড় বা আঁচড়ের চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করা।
স্থানীয় উদ্যোগ ও সমাপনী
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ঝিনাইদহের চিকিৎসকরা আশ্বাস দেন যে, হাসপাতালে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক সেবা ও টিকা সহজলভ্য রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আলোচনা সভা শেষে এক যৌথ অঙ্গীকারের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। বক্তারা প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব শীঘ্রই ঝিনাইদহ জেলাসহ সমগ্র দেশকে জলাতঙ্ক মুক্ত করা সম্ভব হবে।