সুবর্ণ বিশ্বাস,
ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি :
ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের পিচঢালা পথ কিংবা গ্রামের মেঠোপথ জুড়ে শুরু হয় প্যাডেল ঘোরানোর অবিরাম শব্দ। মাথার ওপর প্রখর রোদ, আর পিঠে জমা ঘামের ফোঁটা—এটাই দেশের লাখ লাখ রিকশা ও ভ্যানচালকের দৈনন্দিন জীবনের ধ্রুব সত্য। তবে সময়ের সাথে সাথে চাকা ঘুরলেও বদলায়নি তাদের ভাগ্যের গতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, যান্ত্রিক যানবাহনের আধিপত্য এবং শারীরিক কষ্টের মুখে দাঁড়িয়ে সারাদেশের রিকশা ও ভ্যানচালকেরা আজ চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
মূল্যস্ফীতির কশাঘাত ও আয়ের অসঙ্গতি
সাম্প্রতিক সময়ে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। অথচ সেই তুলনায় রিকশা বা ভ্যানের ভাড়া বাড়েনি। একজন চালক সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যা আয় করেন, তার একটি বড় অংশই চলে যায় গ্যারেজ মালিকের দৈনিক জমা মিটাতে। অবশিষ্ট টাকায় বর্তমান চড়া বাজারে পরিবার নিয়ে দুবেলা দুমুঠো খাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে খাদ্য তালিকা থেকে প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার বাদ গেছে অনেক আগেই; ঘরভাড়া দেওয়া, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বা ওষুধ কেনার সামর্থ্য হারিয়ে তারা আজ দিশেহারা।
আবহাওয়ার দুর্যোগ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি
ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রচণ্ড দাবদাহ—প্রকৃতির কোনো বৈরী রূপই তাদের থামতে দেয় না। কারণ, একদিন গাড়ি চালানো বন্ধ রাখা মানেই রাতে ঘরে হাঁড়ি না চড়া। অতিরিক্ত গরমে পিচঢালা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে তারা হিটস্ট্রোক, তীব্র পানিশূন্যতা, হৃদরোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি মেরুদণ্ডের ব্যথায় ভোগেন। পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং অর্থের অভাবে উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় বহু চালক অকালেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন।
ই-রিকশার দাপট ও চাঁদাবাজি
ব্যাটারিচালিত যানবাহনের দ্রুত প্রসারের কারণে সাধারণ প্যাডেল চালিত রিকশা ও ম্যানুয়াল ভ্যানচালকদের যাত্রী ও ট্রিপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীরা যান্ত্রিক বাহন পছন্দ করায় সনাতন চালকদের আয় নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে অলিগলিতে চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সড়কে চলাচলের নানা বিধিনিষেধ, যা তাদের দৈনন্দিন উপার্জনে বাড়তি মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
সামাজিক সুরক্ষার অভাব ও ঋণের ঘূর্ণিপাক
অনানুষ্ঠানিক খাতের এ বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী এখনও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে। পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের জমানো পুঁজি বলতে কিছুই থাকে না। বাধ্য হয়ে জীবনধারণের তাগিদে তারা এনজিও বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করেন। দিনশেষে সেই ঋণের কিস্তি শোধ করতেই তাদের আয়ের সিংহভাগ চলে যায়, ফলে অভাবের দুষ্টচক্র থেকে তারা কখনোই বের হতে পারেন না।
সময়ের দাবি
দেশের শহর ও গ্রামের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে রিকশা ও ভ্যানচালকদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের এই মানবেতর অবস্থা থেকে তুলে আনতে সরকারি পর্যায়ে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, রিকশাচালকদের জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা, এলাকাভিত্তিক চিকিৎসা সেবা এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। চাকা ঘোরানো এই মেহনতি মানুষদের জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিরাপত্তা না দিলে দেশের সামগ্রিক অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।