ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
‘সাংবাদিক’ শব্দটি উচ্চারণ করলে একসময় চোখে ভাসত একদল অকুতোভয় মানুষের মুখ, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই পেশাটি এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন তথ্যের অবাধ প্রবাহ বেড়েছে, অন্যদিকে অপ-সাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা এবং পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা এই মর্যাদাপূর্ণ শব্দটিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আজকাল হাতে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট থাকলেই অনেকে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করছেন। প্রশিক্ষণহীনতা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবে খবরের গুণমান যেমন কমছে, তেমনি বাড়ছে চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টা।
নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল, আইপি টিভির ভিড়ে আসল ও নকল সাংবাদিক চেনা দায় হয়ে পড়েছে। কিছু অসাধু প্রকাশক ও সম্পাদক অর্থের বিনিময়ে পরিচয়পত্র বিক্রি করে এই মহান পেশাকে কলঙ্কিত করছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ে কাজ করা নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকদের ওপর। তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতন, হামলা ও মামলার শিকার হচ্ছেন। অথচ যে মহান ব্রত নিয়ে তারা কাজ করছেন, সেখানে জীবনের নিরাপত্তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের ১-৭ মে ২০২৬ পর্যন্ত সারাদেশে পালিত হয়েছে ১০ম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সপ্তাহ। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংবাদিক বান্ধব সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষায় রাজপথে সোচ্চার হয়েছে। এবারের আন্দোলনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ১৪ দফা দাবি, যা সাংবাদিকতাকে একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ কাঠামোয় ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
√ সরকারিভাবে সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়ন, পরিচয়পত্র প্রদান এবং বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।
√ সাংবাদিক নিয়োগ নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং সংবাদপত্র ও চ্যানেলের গাড়িকে হরতাল-অবরোধের আওতামুক্ত রাখা।
√ ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী বেতন প্রদান, কল্যাণ ফান্ড গঠন এবং তালিকাভুক্ত সাংবাদিকদের জন্য সরকারি মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা।
√ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশোধন এবং দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগে গ্রেফতার না করা। যেকোনো অভিযোগ কেবল প্রেস কাউন্সিলে দায়েরের বিধান রাখা।
√ পাঠ্যপুস্তকে গণমাধ্যম বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা এবং সরকারি-বেসরকারি পিআরও পদে পেশাদার সাংবাদিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
সাংবাদিকতা কোনো শখের বশে করা ‘কার্ড বাণিজ্য’ নয়, এটি একটি দায়িত্ব। যারা এই পেশায় আসতে চান, তাদের অবশ্যই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধীনে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং নীতিশাস্ত্র মেনে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অপ-সাংবাদিকতা করে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিজের এবং পরিবারের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে।
আজকের এই সংকটকালে সাংবাদিক ভাইদের একে অপরের শত্রু না হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে এবং অধিকার আদায়ে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, গণমাধ্যমের এই সংকট নিরসনে দ্রুত হস্তক্ষেপ করুন। সাংবাদিকরা যদি স্বাধীনভাবে এবং সসম্মানে কাজ করতে না পারেন, তবে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটি ভেঙে পড়বে। আমরা চাই এমন এক পরিবেশ, যেখানে সাংবাদিকতা হবে কেবলই মানুষের কল্যাণে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় হাতিয়ার। সাংবাদিক সমাজের তথা আমাদের দাবি আদায়ের লড়াই চলুক সুস্থ ও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়।
কলমে,
ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
সাংগঠনিক সম্পাদকঃ বৃহত্তর সিলেট জেলা অনলাইন প্রেসক্লাব।