তালাত মাহামুদ, বিশেষ প্রতিনিধি
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় জনগণের সামনে তুলে ধরতে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তথ্যদাতাদের আস্থা অর্জন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আর এ কারণেই সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রণীত “সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা এবং সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় আচরণবিধি”-তে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব, সততা ও নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই আচরণবিধি অনুযায়ী সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তথ্যদাতার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকতার বাস্তবতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসে, যারা পরিচয় প্রকাশ হলে সামাজিক, পেশাগত কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য অনেক সময় গোপন সূত্রের মাধ্যমেই প্রকাশ্যে আসে। তাই তথ্যদাতার পরিচয় সুরক্ষিত রাখা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আইন ও বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, তথ্যপ্রবাহের স্বার্থ এবং তথ্যদাতার নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সাংবাদিকদের ওপর অযৌক্তিকভাবে তথ্যসূত্র প্রকাশের চাপ সৃষ্টি করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হতে পারে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪-এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন করা। একই সঙ্গে পেশাগত মানদণ্ড ও আচরণবিধি প্রণয়নের মাধ্যমে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করা।
তবে তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার অর্থ এই নয় যে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম শর্ত হলো তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা। সত্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর সেই স্বাধীনতার অন্যতম শর্ত হলো তথ্যদাতাদের প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং তাদের পরিচয় যথাযথভাবে সুরক্ষিত রাখা।
অতএব, পেশাগত নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুর আলোকে সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা কেবল একটি অধিকার নয়; এটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও জনমুখী সাংবাদিকতার অপরিহার্য ভিত্তি।
“সংগ্ৰিহিত”