ডা. হা. মাও. হাফিজুল ইসলাম লস্কর:
স্থানীয় সরকার কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তৃণমূল স্তরের ভিত্তি হলো ইউনিয়ন পরিষদ। একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, আধুনিক ও জনবান্ধব হয়ে উঠছে, তার প্রতিফলন ঘটে গ্রামীণ জনপদের এই প্রাথমিক প্রশাসনিক ইউনিটে। তবে একটি আদর্শ, উন্নত ও মডেল ইউনিয়ন পরিষদ রাতারাতি গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন একজন দূরদর্শী, সৎ, দক্ষ এবং সেবাপরায়ণ চেয়ারম্যান। যিনি কেবল প্রথাগত শাসক নন, বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও জনঅংশগ্রহণের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবেন।
একটি আদর্শ ইউনিয়ন পরিষদের মূল ভিত্তি হলো সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। বিগত দিনগুলোতে স্থানীয় সরকারের নানা স্তরে দুর্নীতির যে অভিযোগ আমরা দেখে আসছি, তা থেকে মুক্তি পেতে হলে পরিষদকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি বাজেট ও উন্নয়ন কাজের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুফল। যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও ভিজিএফ- যেন প্রকৃত দরিদ্র ও নারীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
”নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা হলো সেবার মান এবং তা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর সক্ষমতার মধ্যে।” বর্তমান যুগে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বা আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবায়নে ডিজিটাল সেবা ও প্রযুক্তি নির্ভরতা অপরিহার্য। জন্ম নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ বা ট্রেড লাইসেন্সের মতো মৌলিক নাগরিক সেবাগুলো সম্পূর্ণ অনলাইনে নিয়ে এসে ইউনিয়নকে একটি পেপারলেস বা কাগজহীন অফিসে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। এর ফলে যেমন সময় ও হয়রানি কমবে, তেমনি নাগরিক ভোগান্তিও শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এর পাশাপাশি উন্নত রাস্তাঘাট, কালভার্ট নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা একজন যোগ্য চেয়ারম্যানের প্রধান দায়িত্ব।
কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, একটি মডেল ইউনিয়নকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। এলাকার বেকার যুবকদের জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার’ গুলোকে গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সাথে, পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং পঞ্চবার্ষিক বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মডেল ইউনিয়ন পরিষদ কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, বরং সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। একজন সেবাপরায়ণ ও আধুনিক মনস্ক চেয়ারম্যানই পারেন একটি অবহেলিত জনপদকে উন্নত ও আদর্শ ইউনিয়নে রূপান্তর করতে। আসন্ন দিনগুলোতে গ্রামীণ জনপদের মানুষ এমন নেতৃত্বকেই বেছে নেবে- এটাই প্রত্যাশা।