সুবর্ণ বিশ্বাস, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি।
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ও রোহিণী নক্ষত্রের শুভক্ষণে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটি কেবল একটি পৌরাণিক উৎসব নয়, বরং অন্যায় ও পাপাচারের বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় ও সনাতন ধর্মের জয়ের এক মহাসন্ধিক্ষণ।
অবতার তত্ত্ব ও জন্মকাহিনি
শ্রীকৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্ত অত্যন্ত অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বাপর যুগের শেষভাগে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের পাপাচারের মাত্রা চরম সীমায় পৌঁছেছিল। কংস নিজের বোন দেবকী ও ভগ্নিপতি বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করে রাখেন। এক দৈববাণীতে বলা হয়েছিল যে, দেবকীর অষ্টম সন্তানই হবে কংসের নিধনকারী।
সেই অনুযায়ী, তীব্র দুর্যোগময় এক ভাদ্র পূর্ণিমার পর কৃষ্ণপক্ষের গভীর রাতে কারাগারে বন্দি দেবকীর গর্ভে শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। শিশুপুত্রকে কংসের হাত থেকে রক্ষা করতে বসুদেব ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি ও উত্তাল যমুনা নদী পার হয়ে তাঁকে গোকুলে তাঁর পালক পিতা নন্দ ও মাতা যশোদার ঘরে রেখে আসেন এবং বদলে মহামায়াকে নিয়ে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে এই শিশু কৃষ্ণই হয়ে ওঠেন অত্যাচারী কংসের অন্তক এবং অধর্মের বিনাশকারী।
জন্মাষ্টমীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন:
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।”
অর্থাৎ, যখনই পৃথিবীতে ধর্মের গ্লানি ঘটে এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব হয়, তখনই সত্য ও ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ভগবান স্বয়ং যুগে যুগে অবতাররূপে আবির্ভূত হন।
জন্মাষ্টমীর মূল বার্তা হলো—অন্ধকার যতই ঘন হোক না কেন, আলোর আগমন অবশ্যম্ভাবী। দেবকীর অন্ধকার কারাগার যেমন শ্রীকৃষ্ণের আগমনে আলোকিত হয়েছিল, তেমনি মানুষের মনের ভেতরে থাকা অজ্ঞানতা, লোভ ও হিংসার অন্ধকারও কৃষ্ণের ভক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে দূর হতে পারে।
উৎসবের আবহ ও উদযাপন
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিটি মন্দিরে ও ঘরে ঘরে বিপুল আনন্দ- উদ্দীপনা দেখা যায়:
উপবাস ও নিশি-পূজা: ভক্তগণ দিনভর উপবাস থেকে গভীর রাতে (কৃষ্ণের জন্মের ক্ষণে) পূজার্চনা করেন।
দহি হান্ডি ও আনন্দ শোভাযাত্রা: বিশেষ করে ভারতের মহারাষ্ট্রে ‘দহি হান্ডি’ (মাখনের হাঁড়ি ভাঙা) এবং বাংলাদেশে জাকজমকপূর্ণ “জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা” (যেমন ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বের হওয়া ঐতিহাসিক শোভাযাত্রা) আয়োজন করা হয়।
ভোগ ও কীর্তন: শ্রীকৃষ্ণ মাখন ও মিষ্টি পছন্দ করতেন বলে তাঁকে মাখন, তালের বড়া, নাড়ু ও হরেক রকমের মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। মন্দিরগুলোতে চলে অবিরাম হরিনাম কীর্তন ও গীতাপাঠ।
উপসংহার
শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও তাঁর উপদেশ বা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মানবজাতিকে কর্তব্যের পথ, নিষ্কাম কর্ম ও ভক্তির বার্তা দেয়। বর্তমান হিংসা ও অস্থিরতার পৃথিবীতে কৃষ্ণের প্রেম, ন্যায় ও সাম্যের দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জন্মাষ্টমী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকাই জীবনের পরম ধর্ম।