কর্মের কান্ডারী,মাধুরী ব্যানার্জী
নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম শ্যামলপুর। গ্রামের মানুষ দরিদ্র হলেও পরিশ্রমে বিশ্বাসী। কিন্তু গ্রামের অনেক তরুণই ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কাজ এড়িয়ে চলত। তাদেরই একজন ছিল অরিন্দম। সে বলত, “ভাগ্যে যা লেখা আছে, তাই হবে। এত খেটে লাভ কী?”
অন্যদিকে গ্রামেরই বৃদ্ধ শিক্ষক শচীনবাবু প্রতিদিন ভোরে উঠে গাছ লাগাতেন, শিশুদের পড়াতেন, অসুস্থ মানুষের খোঁজ নিতেন। কেউ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু বলতেন, “মানুষের জীবন নদীর মতো। কর্মই সেই নৌকার কান্ডারী। কান্ডারী না থাকলে নৌকা শুধু স্রোতে ভাসে, গন্তব্যে পৌঁছায় না।”
এক বর্ষার রাতে ভয়ংকর বন্যা এলো। নদীর বাঁধ ভেঙে জল ঢুকে পড়ল গ্রামে। চারদিকে হাহাকার। তখন শচীনবাবুর উদ্যোগে গ্রামের মানুষ একসঙ্গে কাজ শুরু করল। কেউ বাঁধে বস্তা ফেলল, কেউ শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিল, কেউ রান্না করে ক্ষুধার্তদের খাওয়াল।
অরিন্দম প্রথমে দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। হঠাৎ সে দেখতে পেল, এক বৃদ্ধা জলের মধ্যে আটকে আছেন। মুহূর্তের মধ্যে নিজের ভয় ভুলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেক কষ্টে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এলো। সেদিন প্রথম সে উপলব্ধি করল—কর্মই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
বন্যার পর গ্রামটি নতুন করে গড়ে উঠল। এবার অরিন্দম আর আগের মতো রইল না। সে গ্রামের যুবকদের নিয়ে রাস্তা মেরামত করল, বৃক্ষরোপণ করল, শিশুদের পড়াশোনায় সাহায্য করল। তার পরিবর্তন দেখে শচীনবাবু মৃদু হেসে বললেন, “আজ তুমি বুঝেছ, ভাগ্য নয়—কর্মই জীবনের আসল কান্ডারী।”
বহু বছর পরে শচীনবাবু আর বেঁচে রইলেন না। কিন্তু গ্রামের প্রবেশদ্বারে একটি ফলকে লেখা হলো—
“যে মানুষ কর্মকে ভালোবাসে, সে-ই নিজের জীবনের কান্ডারী; আর যে সমাজকে ভালোবাসে, সে-ই ইতিহাসের পথপ্রদর্শক।”
সেই লেখা পড়ে প্রতিটি মানুষ নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখল—সাফল্যের নৌকা কখনো ভাগ্যের স্রোতে নয়, কর্মের দাঁড় বেয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়।