আব্দুস সামাদ, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি:
গত বছরের তুলনায় এবার পাটের ভালো দাম পাওয়ার আশায় রংপুর অঞ্চলের অনেক কৃষক আবাদ বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে টানা অতিবৃষ্টি সেই আশা অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। বীজ বপন ও চারার বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ জমিতে পাটগাছ স্বাভাবিক উচ্চতা পায়নি। ফলে গাছ খর্বাকৃতির হওয়ায় আঁশের পরিমাণ কমেছে এবং বিঘাপ্রতি ফলনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কৃষক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পাট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ বছর রংপুর অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় পাটগাছ স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৫ ফুট কম উচ্চতার হয়েছে। এতে বিঘাপ্রতি গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত পাট কম উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফলন কমে যাওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষকের পক্ষে বিনিয়োগের অর্থ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর গ্রামের কৃষক নাদের আলী মণ্ডল (৬০) বলেন, গত বছর আট বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। ভালো দাম পাওয়ায় এবার আবাদ বাড়িয়ে ১০ বিঘা করেছেন। গত বছর প্রতি বিঘায় প্রায় ছয় মণ পাট পেয়েছিলেন। এবার পাঁচ মণেরও কম ফলন হয়েছে। তিনি বলেন, “বীজ বোনার পর থেকেই জমিতে অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে। গাছ ঠিকমতো বাড়তে পারেনি। ফলন কমেছে। এখন পাটের দাম ভালো না হলে উৎপাদন খরচই উঠবে না।” একই গ্রামের কৃষক আবেদ আলী (৭০) বলেন, জীবনে এবারই প্রথম এত খাটো পাটগাছ দেখছেন। অতীতে কখনো এমন হয়নি। তিনি বলেন, “দাম ভালো হলেও লাভ হবে না। গাছ ছোট হওয়ায় আঁশও কম হয়েছে।”
লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় তিনি এক বিঘা জমি বেশি নিয়ে এবার ছয় বিঘায় পাট চাষ করেছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত ফলন পাননি। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় এবার প্রায় ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার টাকা বেশি। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। গত বছর পাঁচ বিঘা জমি থেকে ২৮ মণ পাট পেয়েছিলেন এবং প্রতিমণ ৩ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। এবার ছয় বিঘা জমি থেকে পেয়েছেন মাত্র ২৪ মণ। অথচ উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার টাকা।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুর এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন (৬৫) বলেন, সাত বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘার পাট কাটা হয়েছে। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, “এক বছরের বেশি সময় ধরে কৃষকরা প্রায় সব ফসলেই লোকসান করছেন। আলুতে লোকসান হয়েছে, ধানে কোনোমতে খরচ উঠেছে, ভুট্টার দামও কম। এবার পাটেও ফলন কমে গেল। এভাবে কৃষক টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। গত বছর ৪৮ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৬০ টন পাট। এবারও সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিকভাবে একটি পাটগাছের উচ্চতা ৮ থেকে ১৩ ফুট হয় এবং প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৭ মণ পাট উৎপাদিত হয়। কিন্তু এ বছর বীজ বপন ও চারার বৃদ্ধির সময় দীর্ঘদিন টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। তিনি বলেন, “গাছের উচ্চতা ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত কম হয়েছে। ফলে বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত ফলন কমেছে। গত বছর কৃষকরা ভালো দাম পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার ফলন কমে যাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন।” তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ পাট কাটা হয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশ জমিতে এখনো পাট রয়েছে। বর্তমানে পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে বাজারে নতুন পাট আসতে শুরু করবে।
রংপুর আবহাওয়া অফিস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানান, এ বছর রংপুর অঞ্চলে এপ্রিল মাসে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৫০৪ মিলিমিটার যা গেল বছর ছিলে ১৭০ মিলিমিটার আর মে মাসে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৭৮৬ মিলিমিটার যা গেল বছর ছিলো ১৯৫ মিলিমিটার। পাটচাষের জন্য এপ্রিল ও মে মাসে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত যথেষ্ট।
বাংলাদেশ পাট অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের মুখ্য পরিদর্শক তারানা আফরোজ সজনী বলেন, এ বছর খর্বাকৃতির পাটগাছের কারণে ফলন কম হওয়ায় কৃষকদের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, গত বছর কৃষকরা সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত প্রতিমণ পাট বিক্রি করেছিলেন। এবার এখনো বাজারে নতুন পাটের ব্যাপক সরবরাহ শুরু হয়নি। সরবরাহের ওপরই দাম অনেকটা নির্ভর করবে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পাট রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে দেশের বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেয়ে পাট চাষে আরও উৎসাহিত হবেন। তিনি আরও জানান, কৃষকদের পাট চাষে উৎসাহ দিতে পাট অধিদপ্তর প্রতিবছর উন্নতমানের পাটবীজ ও সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে থাকে। পাশাপাশি বাজারে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে অতিরিক্ত মজুতদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকেও নজরদারি রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে অস্বাভাবিকতা বাড়ছে। বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির মতো সংবেদনশীল সময়ে অতিবৃষ্টি হলে পাটের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। তাই ভবিষ্যতে জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন, সময়োপযোগী চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও কমে যেতে পারে।