হা. মাও. ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
”বিদ্যুৎ আসে না, মাঝে মাঝে দেখা দেয় মাত্র” সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে এই রসিকতাটুকুই এখন তিতা সত্যে পরিণত হয়েছে। তীব্র গরমে যখন ওপরে চড়া আকাশ আর নিচে তপ্ত বাতাস, ঠিক তখন গোলাপগঞ্জবাসীর ওপর চেপে বসেছে বিদ্যুৎ বিভাগের এক অদ্ভুত ‘তেলেসমাতি কারবার’। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই যেখানে বিদ্যুৎ গায়েব থাকে, সেখানে একে আর যাই হোক ‘লোডশেডিং’ বলা চলে না। এটা স্পষ্টত এক চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং গ্রাহকদের সাথে কর্তৃপক্ষের এক নির্মম ভেলকিবাজি।
গোলাপগঞ্জে বিদ্যুৎ এখন যেন আকাশের অমাবস্যার চাঁদ! সামান্য একটু মেঘের আনাগোনা কিংবা মৃদু বাতাস দিলেই যেখানে বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যায়, সেখানে রোদ-গরমে কী অবস্থা হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। গ্রাহকদের অভিযোগ- একবার বিদ্যুৎ গেলে তা কখন ফিরবে, তার কোনো ইয়ত্তা থাকে না। অথচ মাস শেষে পকেটের টাকা খসিয়ে ঠিকই বিদ্যুৎ বিল আদায় করা হচ্ছে। টাকা দিয়ে ভোগান্তি কেনার এই আদিম প্রথা আর কতদিন চলবে, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি গোলাপগঞ্জবাসীর মুখে মুখে।
এই তীব্র তাপদাহ আর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবন আজ পুরোপুরি বিপর্যস্ত। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। ঘরে ঘরে শিশু এবং বয়োবৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। গরমে ছটফট করতে করতে রাত পার করছে মানুষ। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা আইপিএস বা জেনারেটরের ওপর ভরসা করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বিদ্যুৎ এত কম সময় থাকে যে, এসব যন্ত্র চার্জ হওয়ার ন্যূনতম সময়টুকুও পাচ্ছে না। অন্যদিকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই লোডশেডিংয়ের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে গোলাপগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র কলকারখানাগুলো। ফ্রিজে রাখা কাঁচামাল ও পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হয়ে লোকসান গুনছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট-ভিত্তিক ব্যবসাগুলো লাটে উঠেছে। দিনের বেলা গরমে আর রাতের বেলা অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পড়াশোনার যে কী অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো বিদ্যুৎ বিভাগের অন্ধ-বধির ও দায়িত্বহীন ভূমিকা। দুর্ভোগের চরম সীমায় পৌঁছে যখন অতিষ্ঠ মানুষ বিদ্যুৎ অফিসের নম্বরে ফোন দেয়, তখন কেউ ফোন ধরে না। আর ভাগ্যক্রমে যদি কেউ ধরেও ফেলে, তবে তাদের কণ্ঠে ঝরে পড়ে চরম উদাসীনতা ও দায়সারা ভাব। গ্রাহকদের প্রতি এই অবহেলা আর কতদিন চলবে? আমরা কি কোনো সভ্য সমাজে বাস করছি, নাকি আদিম কোনো অন্ধকার যুগে আমাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
গোলাপগঞ্জের সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। বিদ্যুৎ নিয়ে এই খামখেয়ালিপনা ও সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলার এই খেলা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। জনদুর্ভোগকে প্রাধান্য দিয়ে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এই চরম অব্যবস্থাপনা দূর করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। গোলাপগঞ্জবাসীর এই বুকফাটা হাহাকার ও দুর্ভোগ দেখার কি আসলেই কেউ নেই?
লেখক,
হা. মাও. ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
ইসলামী স্কলার, কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও ইউনানী চিকিৎসক।