-মাধুরী ব্যানার্জী
পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট এক গ্রামে বাস করত অদ্বৈত নামে এক যুবক। ছোটবেলা থেকেই তার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেত—এই বিশাল পৃথিবীর অন্তরালে কী লুকিয়ে আছে? আকাশের নীলিমা, নদীর স্রোত, মানুষের হাসি-কান্না—সবকিছুর মধ্যে কি কোনো এক অদৃশ্য সূত্র কাজ করে?
একদিন ভোরবেলায় সে বেরিয়ে পড়ল উত্তর খুঁজতে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সে পৌঁছাল এক নির্জন অরণ্যে। সেখানে এক বৃদ্ধ সাধকের সঙ্গে তার দেখা হলো।
অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল, “গুরুজন, আমি বিশ্বরূপ দেখতে চাই। জানতে চাই, এই সৃষ্টির প্রকৃত রূপ কী?”
সাধক মৃদু হেসে বললেন, “বিশ্বরূপকে চোখে দেখা যায় না, তাকে উপলব্ধি করতে হয়। তবু তুমি চেষ্টা করো।”
সেই রাতে অরণ্যের মাঝখানে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রইল অদ্বৈত। হঠাৎ তার চারপাশের সবকিছু যেন বদলে যেতে লাগল। বৃক্ষের পাতাগুলো আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে, নদীর কলতান যেন সঙ্গীত হয়ে উঠেছে, আকাশের তারাগুলো এক অদ্ভুত ছন্দে নৃত্য করছে।
সে দেখল, একটি শিশুর হাসি আর এক বৃদ্ধের অশ্রু একই স্রোতে মিলিত হচ্ছে। ফুলের সুগন্ধ, ঝড়ের তাণ্ডব, জন্ম আর মৃত্যু—সব এক বিশাল চক্রের অংশ। সে অনুভব করল, বিশ্বরূপ কোনো একক চেহারা নয়; এটি অসংখ্য রূপের সমন্বয়।
মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে যেন সমগ্র সৃষ্টির হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু ঠিক তখনই সেই দৃশ্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
পরদিন সকালে সে সাধকের কাছে ফিরে এল।
“আমি বিশ্বরূপ দেখেছিলাম,” অদ্বৈত বলল, “কিন্তু তা আবার হারিয়ে গেল।”
সাধক বললেন, “তুমি যা দেখেছ, তা ছিল বিশ্বরূপের ছায়া মাত্র। প্রকৃত বিশ্বরূপ অসীম। মানুষ তার সম্পূর্ণতা ধারণ করতে পারে না। তবে সেই ছায়ার মধ্যেই সত্যের আভাস পাওয়া যায়।”
অদ্বৈত বুঝতে পারল, উত্তর কোনো দূর দেশে লুকিয়ে নেই। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি মুহূর্তেই সেই অসীম রূপের ছায়া বিদ্যমান।
সেদিন থেকে সে আর বিশ্বরূপকে খুঁজতে বেরোল না। বরং প্রতিদিনের জীবনের মধ্যেই তার ছায়াকে অনুভব করতে শিখল। আর সেই উপলব্ধিই তাকে দিল গভীর শান্তি।