ডা. হা. মাও. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
আমাদের সমাজে পীর-আউলিয়া এবং ওলীদের মাজারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের আবেগ ও ভক্তি কাজ করে। যুগ যুগ ধরে এই মাজারগুলো ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও জনকল্যাণমূলক কাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে অনেক সময়ই একটি জটিল প্রশ্ন সামনে চলে আসে, কোনো ওলীর মাজার কি কারো ব্যক্তিগত বা পৈত্রিক সম্পত্তি হতে পারে? মাজারের খাদেম বা বংশধরেরা কি এর মালিকানা দাবি করতে পারেন?
ইসলামী শরীয়ত এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন। উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এর উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট- কোনো ওলীর মাজার বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কবরস্থান কখনোই কারো ব্যক্তিগত পৈত্রিক সম্পত্তি হতে পারে না।
নিচে ধর্মীয় ও আইনি ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করলাম-
√ কোনো স্থান যখন মাজার, মসজিদ বা জনসাধারণের জন্য কবরস্থান হিসেবে নির্ধারিত ও ব্যবহৃত হয়ে যায়, তখন ইসলামী পরিভাষায় সেটি ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’ বা আল্লাহর মালিকানাধীন হয়ে যায়। একবার কোনো সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ বা ওয়াকফ হয়ে গেলে, তার ওপর থেকে মানুষের ব্যক্তিগত মালিকানা চিরতরে বিলুপ্ত হয়।
√ ইসলামী উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ আইন কেবল ব্যক্তির নিজস্ব বৈধ ও বৈষয়িক সম্পত্তির ওপর কার্যকর হয়। যেহেতু মাজার কোনো ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি নয়, তাই পিতার মৃত্যুর পর তার সন্তান বা বংশধরেরা মিরাস বা পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে মাজারের জমির মালিকানা লাভ করতে পারেন না।
√ মাজারের দেখভালের দায়িত্বে যারা থাকেন (তা সে পীরের বংশধর হোক বা খাদেম সম্প্রদায়), শরীয়তের দৃষ্টিতে তারা মালিক নন, বরং কেবল ‘মুতাওয়াল্লি’ বা ব্যবস্থাপক। মাজারের সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে তারা নিয়ম মেনে সেখান থেকে সম্মানী বা সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন, কিন্তু মাজারের মূল জমি বা অবকাঠামোর মালিকানা দাবি করার কোনো অধিকার তাদের নেই।
আমাদের দেশের ভূমি ও ধর্মীয় সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনও ইসলামী শরীয়তের এই নীতিকে পুরোপুরি সমর্থন করে। বাংলাদেশে প্রায় সব বড় ও ঐতিহাসিক মাজার ‘বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন’ অথবা সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ওয়াকফ এস্টেট’ হিসেবে নিবন্ধিত। আইন অনুযায়ী, এই সম্পত্তিগুলো আর কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের কেনাবেচা বা হস্তান্তরের সুযোগ থাকে না। মাজারগুলোর ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা, ভক্তদের নিরাপত্তা এবং দান-অনুদান বা আয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার যেকোনো সময় পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মাজারকে নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে গেলে তা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
এখানে একটি সূক্ষ্ম ও ব্যতিক্রমী বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন। যদি কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব কেনা বা পৈত্রিক জমির একটি নির্দিষ্ট অংশে তার পরিবারের কোনো সদস্যকে দাফন করেন এবং সেটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না করেন, তবে সেই জমির মালিকানা অবশ্যই তার পরিবারের কাছেই থাকে। কিন্তু, সেই সমাধিটি যদি সময়ের পরিক্রমায় জনসমক্ষে কোনো “ওলীর মাজার” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তদের যাতায়াত শুরু হয় এবং জনসাধারণের দান-অনুদান আসা শুরু করে। তখন সামাজিক, ধর্মীয় ও আইনি বাস্তবতার নিরিখে সেটিকে আর নিছক “ব্যক্তিগত সম্পত্তি” হিসেবে আটকে রাখা যায় না। তখন তা জনসাধারণের ধর্মীয় আবেগের অংশ এবং পরোক্ষভাবে ওয়াকফ সম্পত্তির রূপ নেয়।
মাজার বা আউলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো কোনো ব্যবসা বা ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার হাতিয়ার নয়। এটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক স্থান। তাই শরীয়ত এবং রাষ্ট্রীয় আইন। উভয় দিক থেকেই মাজারের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং একে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও পৈত্রিক সম্পত্তির বেড়াজাল থেকে মুক্ত রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
লেখক,
ডা. হা. মাও. হাফিজুল ইসলাম লস্কর।
সাবেক ইন্টার্ণী চিকিৎসক- সিলেট সরকারী ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক-বিএমএসএস কেন্দ্রীয় কমিটি।
সাংগঠনিক সম্পাদক- বাংলাদেশ ইন্ডিজেনাস মেডিকেল সোসাইটি।
সাংগঠনিক সম্পাদক- বৃহত্তর সিলেট জেলা অনলাইন প্রেসক্লাব।
সম্পাদক ও প্রকাশক- শব্দের আলাপন।
সম্পাদক- সাপ্তাহিক ইউনানী কন্ঠ।
সদস্য সচিব- আল ইখওয়ান সোসাইটি।
সদস্য – ইচ্ছাশক্তি সাহিত্য পরিবার।
সদস্য- গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাব।
সাবেক শিক্ষক- জামেয়া দারুল উলূম সিলেট।
সাবেক শিক্ষক- ফাতেমা (রা.) নূরিয়া মহিলা মাদ্রাসা।