হাফিজুল ইসলাম লস্কর, স্টাফ রিপোর্টারঃ
জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্তি থাকলেও সাড়ে তিন বছরেও আলোর মুখ দেখেনি অল্টারনেটিভ মেডিসিন বা বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি (‘স্কোপ অব প্র্যাকটিস’)। ফলে ডিগ্রিধারী ও সরকার নিবন্ধিত চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে প্রতিনিয়ত চরম বৈষম্য, পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা এবং মোবাইল কোর্টের প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা। দীর্ঘদিনের এই প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অচলাবস্থা নিরসনে এবার অধিকার আদায়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে যাচ্ছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসকেরা।
বিকল্প চিকিৎসা খাতের দীর্ঘদিনের দাবি মূল্যায়নে ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি একটি উচ্চপর্যায়ের ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। ডিপ্লোমা ইন ইউনানী মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (DUMS) এবং ডিপ্লোমা ইন আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (DAMS) চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সমতা নিরূপণ ও ‘স্কোপ অব প্র্যাকটিস’ নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এই কমিটিকে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কমিটি গঠনের পর সাড়ে তিন বছর অতিবাহিত হলেও আজও সেই সুনির্দিষ্ট কার্য-পরিধি চূড়ান্ত বা বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে দেশের ঐতিহ্যগত ও বিজ্ঞানসম্মত এই চিকিৎসা খাতের গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হতাশা ও পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে। এই অচলাবস্থা নিরসনে এবার আদালতের দ্বারস্থ হতে যাচ্ছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসকেরা।
জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে অল্টারনেটিভ মেডিসিনকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও প্রশাসনিক স্বীকৃতি, সম্মানজনক পদবি এবং কাজের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বড় ধরনের আইনি ও নীতিগত জটিলতা। বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগবিধি ও কার্য-পরিধি স্পষ্ট না করায় মাঠপর্যায়ে চিকিৎসকেরা প্রতিনিয়ত নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।
সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না থাকায় ডিগ্রিধারী ও সরকার নিবন্ধিত চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে তাদের যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। উল্টো, ‘স্কোপ অব প্র্যাকটিস’ চূড়ান্ত না হওয়ার সুযোগে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রায়ই নিবন্ধিত চিকিৎসকদের কার্যক্রমকে অবৈধ বা ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করে জরিমানা ও প্রশাসনিক হয়রানি করছে।
ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার উচ্চতর কারিকুলামে (যেমন: BUMS/BAMS) অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজির মতো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো পড়ানো হয়। কিন্তু নীতিমালা না থাকায় চিকিৎসকেরা চিকিৎসার প্রয়োজনে কোন কোন আধুনিক ডায়াগনস্টিক টেস্ট লিখতে পারবেন বা কতটুকু জরুরি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ব্যবহার করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত আইনি বিতর্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এছাড়াও একটি নির্দিষ্ট আইনি ফ্রেমওয়ার্ক না থাকায় চিকিৎসকেরা সবসময় একটা অজানা আতঙ্ক ও পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে প্র্যাকটিস করছেন। এতে চিকিৎসকদের মেধা ও যোগ্যতার সঠিক বিকাশ ঘটছে না এবং রোগীরাও তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সিলেট সরকারী ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইন্টার্ণী চিকিৎসক প্রদীপ চন্দ্র বৈষ্ণব বলেন, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেবল একটি ঐতিহ্যগত পদ্ধতিই নয়, এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। এই খাতের চিকিৎসকদের কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট করে দিলে একদিকে যেমন চিকিৎসকদের অধিকার রক্ষা হবে, অন্যদিকে রোগীরাও নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পাবেন।”
একই সুর শোনা গেল মাঠপর্যায়ের ইউনানী চিকিৎসক আব্দুল লতিফের কণ্ঠেও। তিনি জানান, সঠিক নীতিমালা এবং কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট না থাকার কারণে তারা পেশাগতভাবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্কোপ অব প্র্যাকটিস’ থাকলে তারা আইনগতভাবে ও নির্ভয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারতেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অল্টারনেটিভ মেডিসিন বিভাগের তৎকালীন পরিচালক ডা. মো: মাছুদুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক ডা. মো. রাশিদুজ্জামান খানের যৌথ স্বাক্ষরিত স্মারকটি (স্মারক নং-৫৯.১৪.০০০০.১১১.৪১.১৪.২২-২৩) সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে অবগতির জন্য পাঠানো হলেও সাড়ে তিন বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের প্রতি চলমান প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে আইনি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বঞ্চিত চিকিৎসকদের অধিকার সুরক্ষায় এবার উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন ‘বাংলাদেশ ইন্ডিজেনাস মেডিকেল সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক ডা. জাফর হোসেন খান। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের আইনি অধিকার ও পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তিনি উচ্চ আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ডকে জরুরি ভিত্তিতে তিনটি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে।
১. ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা আইনগতভাবে কী কী চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারবেন- তা স্পষ্ট করে একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্কোপ অব প্র্যাকটিস’ প্রণয়ন করে দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে।
২. মোবাইল কোর্ট ও ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তাদের এই চিকিৎসা পদ্ধতির আইনি ভিত্তি এবং চিকিৎসকদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রয়োজন, যেন ভুল বোঝাবুঝির কারণে কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক হয়রানির শিকার না হন।
৩. ঐতিহ্যগত চিকিৎসকদের অধিকার সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিকিৎসকদের এই যৌক্তিক দাবি পূরণ ও কমিটির রিপোর্টের দ্রুত বাস্তবায়ন হলে একদিকে যেমন অল্টারনেটিভ মেডিসিন ধারার চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার সুসংহত হবে, অন্যদিকে দেশের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের বিকল্প চিকিৎসাপ্রাপ্তিও সহজ ও নিরাপদ হবে।