এম আর সুমন
প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক
ইনসানিয়াত লাইভ ব্লাড ফাউন্ডেশন
বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে একশ্রেণির মহলের দ্বারা ধর্মীয় মেরুকরণ সৃষ্টির অভিযোগ উঠছে। এর ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নানামুখী সামাজিক চাপ ও বৈষম্য বজায় রাখার যে চিত্র প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক গণমাধ্যমে সামনে আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অথচ, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতন সমাজের আদি শাস্ত্রগুলোতে একজন শাসকের জন্য ‘রাজধর্ম’ পালন এবং অদ্বৈত চেতনার যে কঠোর নির্দেশ রয়েছে, তা লঙ্ঘন করে কোনো উগ্রবাদী আচরণ কখনোই ধর্মীয়ভাবে বৈধ হতে পারে না। মহাভারতের শান্তিপর্বে পিতামহ ভীষ্ম স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজার প্রধান কর্তব্য হলো রাজ্যে বসবাসকারী সমস্ত প্রজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—তা সে যেকোনো জাতি, বর্ণ বা উপাসনা পদ্ধতিরই হোক না কেন। যে শাসক নিজের স্বার্থে প্রজাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে বা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন চালায়, সেই প্রজাপীড়ক শাসকের পতন অনিবার্য। একইভাবে মনুস্মৃতির সপ্তম অধ্যায়ের ১৪৩ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, পৃথিবী যেমন ভালো-মন্দ বিচার না করে সমস্ত জীবকে সমানভাবে আশ্রয় ও ধারণ করে, একজন প্রকৃত শাসকের ব্রতও তেমন হওয়া উচিত, যাতে তিনি তাঁর রাজ্যের সমস্ত নাগরিককে সমানভাবে লালন ও রক্ষা করেন। তাছাড়া, ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিখ্যাত “সমানী ব আকূতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ” (তোমাদের সংকল্প এক হোক, তোমাদের হৃদয় এক হোক) বাণীটি সমাজকে বিভেদ নয়, বরং পরম ঐক্যের শিক্ষা দেয়; যা প্রমাণ করে যে অন্য ধর্মের মানুষকে আঘাত করা আসলে সনাতন শাস্ত্রেরই চরম অবমাননা।
এই সর্বজনীন শান্তির সুর সমভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে ইসলাম ধর্মেও। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না; নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) সুনানে আবু দাউদের সহীহ হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো মুসলমান যদি কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর অত্যাচার করে, তার অধিকার খর্ব করে, তার ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয় বা তার অনুমতি ছাড়া তার কোনো বস্তু কেড়ে নেয়—তবে কেয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহর আদালতে রাসুল (সা.) নিজেই সেই অত্যাচারী মুসলমানের বিরুদ্ধে বাদী হবেন। একইভাবে খ্রিস্টধর্মের মূল ভিত্তিই হলো পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেম, যেখানে পবিত্র বাইবেলের মথি লিখিত সুসমাচারের ২২ নম্বর অধ্যায়ের ৩৯ শ্লোকে পরম নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, “তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।” এখানে ‘প্রতিবেশী’ বলতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে। আবার বাইবেলের হিতোপদেশের ১৪ অধ্যায়ের ৩১ শ্লোকে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি দরিদ্র বা অসহায়কে নিপীড়ন করে, সে আসলে তার সৃষ্টিকর্তাকেই অবজ্ঞা ও অপমান করে। অপরদিকে, বৌদ্ধধর্মের মূল দর্শনই হলো অহিংসা, মৈত্রী ও করুণা; যেখানে ধম্মপদে শাসকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে—বলপ্রয়োগ বা ভয় দেখিয়ে নয়, বরং ধার্মিকতা ও ন্যায়ের দ্বারা শাসন করাই প্রকৃত শাসন। সুত্তনিপাতের বিখ্যাত ‘করণীয় মেত্ত সুত্ত’-এ গৌতম বুদ্ধ নির্দেশ দিয়েছেন যে, একটি মা যেমন নিজের জীবন দিয়ে তাঁর একমাত্র সন্তানকে রক্ষা করেন, ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের উচিত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত জীবের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার মন গড়ে তোলা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যেন প্রকৃত সম্প্রীতি ও শান্তি বিরাজমান থাকে এবং যে দেশেই যে ধর্মের মানুষ সংখ্যালঘু হোক না কেন, তারা যেন তাদের ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা পায়—এই উদার দৃষ্টিভঙ্গিই হলো পৃথিবীর সমস্ত পবিত্র গ্রন্থের মূল নির্যাস। বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে শাসকেরা যদি সংকীর্ণ রাজনৈতিক উস্কানি ও ক্ষমতার লোভ পরিহার করে এই শাশ্বত ধর্মীয় বাণীগুলো হৃদয়ে ধারণ করেন এবং নিজ নিজ রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করেন, তবেই সমাজ থেকে বিদ্বেষের অন্ধকার দূর হবে এবং পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।