খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন
আজ চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আকাশ থেকে ঝরা অঝোর ধারা, নদী উপচে পড়া ঢল আর পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে দিশেহারা আমার বাংলাদেশ। দেশের এমন কোনো ইঞ্চি জায়গা অবশিষ্ট নেই, যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে শুকনো পায়ে দাঁড়াতে পারছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রাম—সবখানেই আজ জলমগ্ন হাহাকার।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের রাস্তাগুলো আজ নদীর রূপ নিয়েছে। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও ঘটছে ভূমিধস। শিশু-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ জীবন হাতে নিয়ে দিনাতিপাত করছে। একটু অসতর্ক পা ফেললেই যেন নিশ্চিত অন্ধকার খাদ। কিন্তু শহরের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন গ্রামে। ঘরবাড়ির চাল পর্যন্ত ডুবে গেছে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার এত ওপর দিয়ে বইছে যে, জনজীবন প্রায় স্থবির।
এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে করুণ দিক হলো সুপেয় পানির তীব্র সংকট। চাপকলগুলো ডুবে যাওয়ায় মানুষ এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছে। নেই রান্নার জ্বালানি। ভেজা কাঠ আর ভেজা চাল নিয়ে আর্তনাদ করছে ক্ষুধার্ত শিশু। মা যখন সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছে বলেন, ‘বাবা, চুলা জ্বলে না’, তখন সেই কান্নার কোনো ভাষা থাকে না।
কৃষক আর খামারিদের কথা ভাবুন। যাদের সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল হাঁস-মুরগির খামার কিংবা মাছের পুকুর, এক রাতের বন্যায় সব ভেসে গেছে। ব্যাংকের ঋণ আর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজ তারা নিঃস্ব, দিশেহারা। তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি হলো, এই মহাপ্রলয়ে শেষ বিদায়টুকু দেওয়ার মতো মাটিও অবশিষ্ট নেই। কবর দেওয়ার শুকনো মাটি বা দাহ করার কাঠের অভাবে বাবা তার সন্তানের লাশ, স্বামী তার প্রিয়তমা স্ত্রীর লাশ কলার ভেলায় তুলে স্রোতে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। নিজের প্রিয়জনকে শেষবারের মতো মাটিতে শায়িত করতে না পারার চেয়ে বড় কষ্ট এই পৃথিবীতে আর কী হতে পারে?
এই মুহূর্তে আর চুপ করে বসে থাকার সুযোগ নেই। দল-মত নির্বিশেষে আজ আমরা সবাই কেবল ‘বাংলাদেশি’। আমাদের পরিচয় আজ ‘বন্যার্ত’। রাষ্ট্রকে তার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে—সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী থেকে শুরু করে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে উদ্ধারকাজে নামতে হবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
আপনার দেওয়া এক প্যাকেট শুকনো খাবার, একটি ত্রিপল, এক প্যাকেট ওরস্যালাইন বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট—আজ কারও কাছে এটি জীবন-মরণের সমাধান। যার সামর্থ্য আছে অর্থ দিয়ে, যার শক্তি আছে কায়িক শ্রম দিয়ে—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। যার কিছুই নেই, সে অন্তত দুই হাত তুলে দোয়া করুক।
মনে রাখবেন, এই পানির নিচে শুধু আমাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে না; ডুবছে এক মায়ের স্বপ্ন, এক বাবার শেষ সম্বল আর অগণিত শিশুর ভবিষ্যৎ। হে আমার বাংলাদেশ, তুমি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৯১-এর ঘূর্ণিঝড় পেরিয়ে এসেছ। তুমি আবারও উঠে দাঁড়াবে। আমরা তোমার পাশে আছি। আজ যদি আমরা একে অপরের পাশে না দাঁড়াই, তবে কাল এই বন্যার পানিই আমাদের চোখের পানি হয়ে ফিরে আসবে।
লেখক: আহ্বায়ক ও প্রধান সংগঠক, নিরাপদ খাদ্য খাই (নিখাখা)