ওসমানীনগর (সিলেট) প্রতিনিধি:
আমার জীবন চলার পথে পৃথিবীর বুকে কোনো মানুষকে যদি গভীরভাবে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা করে থাকি, তিনি হলেন আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় সিলেটের সিংহপুরুষ, ওসমানীনগরের কৃতী সন্তান—মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. আতাউল গনি ওসমানী।
আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই—যে মহানায়ক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর অবদানকে আমরা কেন যথাযথভাবে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারলাম না?
বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সর্বোপরি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন এই মহান ব্যক্তিত্বকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও ব্যাপক গবেষণা, শিক্ষা ও স্মরণচর্চা গড়ে উঠল না?
তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা ও তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয় নিয়েও মানুষের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর প্রতি কোনো ধরনের হামলা বা গুলিবর্ষণের ঘটনা যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তার প্রকৃত কারণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জাতির সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। ইতিহাসের প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসের দলিল ও নিরপেক্ষ গবেষণার মাধ্যমেই জাতির সামনে আসা উচিত।
সম্প্রতি তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা দেখেছি। কিন্তু একই সঙ্গে মনে হয়েছে—রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা কি তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু যথেষ্টভাবে দিতে পেরেছি?
আমার প্রশ্ন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছেও। এই দুই রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। কিন্তু কেন কোনো সরকারই জেনারেল ওসমানীর অবদানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি, দল-মতের ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করল না?
বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে তাকালে জেনারেল ওসমানীর মতো একজন ব্যক্তিত্বকে নতুন প্রজন্মের কাছে সবার আগে পরিচিত করে তোলার কথা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী অনেক সময় নীরবেই চলে যায়।
আমি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করি। এখানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস অনুসন্ধান করলে অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের অবদান সম্পর্কে সহজেই তথ্য পাওয়া যায়। অথচ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ককে নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কেন এত অজ্ঞতা ও নীরবতা—এই প্রশ্ন আমাকে ভাবায়।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে। এখন কি আমাদের সময় হয়নি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীকে নতুন প্রজন্মের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরার?
আমরা চাই না ইতিহাস কোনো দল বা ব্যক্তির রাজনৈতিক সম্পত্তি হয়ে থাকুক। ইতিহাস হোক সত্য, গবেষণাভিত্তিক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত।
সিলেটের এই কৃতী সন্তান শুধু সিলেটের নন—তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ সন্তান। তাঁর অবদানকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদের সবার দায়িত্ব।
জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে আরও গবেষণা হোক, তাঁর জীবন ও অবদান পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে স্থান পাক, তাঁর নামে জাতীয় পর্যায়ে স্থায়ী স্মারক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক—এটাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার দাবি।
ইতিহাসকে নীরবতায় হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
লিখা পাঠিয়েছেন
ছমির আহমদ
লন্ডন টাওয়ার হ্যামলেট।