আওরঙ্গজেব কামাল
দেশজুড়ে একসঙ্গে একাধিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং, তীব্র তাপদাহ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জনজীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এসব প্রতিকূল পরিস্থিতির ফলে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ ও মাংসসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম গত কয়েক মাসে একাধিকবার বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে গিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে; অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি—আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ ও সরবরাহ সংকটের কারণে দাম বাড়ছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার তদারকির অভাব এবং অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে নিত্যপণ্যের দাম আবারও এক দফা বেড়েছে। মিরপুর কাঁচাবাজারে তরিকুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, “বাজারে এখন ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া দুষ্কর। আমরা সাধারণ মানুষ চরম বিপদে আছি।” কয়েকজন গৃহিণী জানান, আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন তা দিয়ে তিন দিনও চলা সম্ভব হচ্ছে না। বাজার তদারকির ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই এর জন্য দায়ী করছেন ভোক্তারা।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকট ও সীমাহীন লোডশেডিং জনজীবনে নতুন করে ভোগান্তি যোগ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনে একাধিকবার দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তীব্র গরমে বিদ্যুৎহীনতায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা মারাত্মক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শিল্পকারখানাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় পানি উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে চলমান তাপদাহ যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। এতে ঘরের ভেতরে বা বাইরে—কোথাও স্বস্তি মিলছে না। তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে এবং হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় দিনে ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার উপকণ্ঠসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও রাজশাহীর বাসিন্দারা এই সংকটে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
এরই মাঝে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যার মতো অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও তৎপরতা অনতিবিলম্বে বাড়ানো প্রয়োজন, নাহলে জানমালের নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়লে সাধারণত অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করলেই হবে না, বরং সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তারা বাজার তদারকি জোরদার করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী জনগণের প্রত্যাশা, এই বহুমুখী সংকট থেকে দ্রুত মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যাতে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আসে এবং জনজীবনে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
লেখক ও গবেষক:
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি, ঢাকা প্রেসক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব।
উপদেষ্টা
দৈনিক মুক্তি সমাচার ডিএমএস টিভি ও ইনসানিয়াত লাইভ ব্লাড ফাউন্ডেশন