সভাপতি, ঢাকা প্রেস ক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব;
উপদেষ্টা: দৈনিক মুক্তি সমাচার, ডিএমএস টিভি ও ইনসানিয়াত লাইভ ব্লাড ফাউন্ডেশন।
জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে তীব্র সরবরাহ সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। একদিকে আকাশচুম্বী দাম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি না পেয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। এই দ্বিমুখী সংকটে শুধু পরিবহন খাত নয়, বরং নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরেই সৃষ্টি হয়েছে এক বহুমুখী বিপর্যয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই জ্বালানি নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা থেকে শুরু করে পণ্যবাহী ট্রাক—সবই দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষার প্রহরে। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর অনেককেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল না দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে, আবার অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে চালকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের উপার্জনে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকার যখন বলছে দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানির মজুত রয়েছে, তখন মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বর্তমানে সরকারের দাবি অনুযায়ী ১৪ থেকে ৩১ দিনের জ্বালানি মজুত থাকলেও পাম্পগুলোতে কেন হাহাকার, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এই কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যে অসাধু চক্র বা ‘সিন্ডিকেট’-এর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সাধারণ ভোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগ উঠেছে, কিছু পাম্প মালিক এবং সরবরাহকারী গোষ্ঠী যোগসাজশ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কোনো কোনো স্থানে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লিটার দরে অকটেন বিক্রির খবরও পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে প্রশাসনের অভিযানে বেশ কিছু অবৈধ মজুত উদ্ধার ও জরিমানা করা হয়েছে। তবে পাম্প মালিকদের একাংশের দাবি, সরবরাহকারী সংস্থা থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তারা সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না।
জ্বালানি সংকটের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হু হু করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় লাইনে বসে থাকায় তারা নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না, যা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাত অত্যন্ত সংবেদনশীল। মজুত ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ চেইন (Supply Chain) শক্তিশালী না হলে এমন অস্থিরতা বারবার ফিরে আসবে। এই সংকট নিরসনে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা:
১. সরকারের কঠোর বাজার তদারকি ও নীতিগত স্বচ্ছতা।
২. পাম্প মালিকদের দায়িত্বশীল আচরণ ও অনিয়ম বন্ধ করা।
৩. ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত না করা।
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জ্বালানি খাতের এই অরাজকতা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সিন্ডিকেট দমনের মাধ্যমেই বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।