বিশেষ প্রতিনিধি নাহিদ ইসলাম, ঢাকা
সকাল থেকেই শ্রাবণের চেনা রূপ—কখনও মুষলধারে বৃষ্টি, তো কখনও দমকা হাওয়া। প্রকৃতি যখন ঘরে বসে বৃষ্টির গান শোনার আবহ তৈরি করেছে, ঠিক তখনই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে যুদ্ধের ময়দানে নামতে হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের। বৈরী আবহাওয়া আর শহরের চিরচেনা জলাবদ্ধতার কারণে আজ সকালে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার দৃশ্যটি আর সাধারণ কোনো যাত্রার মতো ছিল না; এটি রূপ নিয়েছিল এক চরম অগ্নিপরীক্ষায়।
মোড়ে মোড়ে জমে থাকা হাঁটু সমান নোংরা পানি আর গণপরিবহনের তীব্র সংকট মাড়িয়েই আজ কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে হাজারো পরীক্ষার্থী ও তাদের উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের।
নোংরা পানি আর যানবাহনের সংকট: পথে পথে দুর্ভোগ
সকাল থেকেই রাজধানীর নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমতে শুরু করে। অলিগলি ছাড়িয়ে মূল সড়কেও কোথাও গোড়ালি, আবার কোথাও হাঁটু সমান পানি জমে যায়। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় সংকটে পড়তে হয় পরীক্ষার্থীদের।
রিকশা ও সিএনজির চড়া ভাড়া: জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। আর এই সুযোগে রিকশা ও সিএনজি চালকেরা দুই থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া দাবি করেন। বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক বাড়তি টাকা দিয়েই সন্তানদের কেন্দ্রে নিয়ে গেছেন, আবার অনেককে পায়ে হেঁটেই রওনা দিতে হয়েছে।
ভিজে গেছে পরিধেয় বস্ত্র ও প্রবেশপত্র: ছাতা বা রেইনকোটও শিক্ষার্থীদের শেষ রক্ষা করতে পারেনি। বাতাসের ঝাপটায় অনেকেরই পোশাক সম্পূর্ণ ভিজে যায়। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় ছিল, নোংরা পানি বাঁচিয়ে চলতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর অতি প্রয়োজনীয় প্রবেশপত্র (Admit Card) ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।
পরীক্ষা শুরুর আগেই মানসিক ক্লান্তি: নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই রওনা দিয়েও জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী ঠিক পরীক্ষার আগ মুহূর্তে কেন্দ্রে পৌঁছায়। পরীক্ষা শুরুর আগে যেখানে শান্ত মনে বসার কথা, সেখানে ভেজা কাপড়ে, দুশ্চিন্তা আর শারীরিক ক্লান্তি নিয়ে তাদের পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে হয়েছে।
”পরীক্ষা হলের চেয়ে রাস্তার যুদ্ধই বড় ছিল”
পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ছিল ক্লান্তি ও ক্ষোভের ছাপ। কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়া এক শিক্ষার্থী তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলে:
”পরীক্ষা হলের ৩ ঘণ্টার চেয়ে সকালের ১ ঘণ্টার রাস্তার যুদ্ধটা বেশি কঠিন ছিল। জুতো হাতে নিয়ে, হাঁটু পানি ভেঙে কেন্দ্রে আসতে হয়েছে। পুরো পা ভিজে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। এই মানসিক চাপ নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া যে কতটা কষ্টের, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।”
এক ভুক্তভোগী মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
”আমরা জানি এই মরসুমে বৃষ্টি হবে। কিন্তু আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কেন একটু বৃষ্টিতেই ভেঙে পড়বে? বাচ্চাদের জীবনের এত বড় একটা পরীক্ষা, অথচ রাস্তায় কোনো ট্রাফিক বা প্রশাসনের বিশেষ সাহায্য চোখে পড়েনি। পরীক্ষা দিতে এসে যদি বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে এর দায় কে নেবে?”
এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা ও শারীরিক ধকল যে তাদের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না—এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, অন্তত পাবলিক পরীক্ষার দিনগুলোতে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা বা জরুরি উদ্ধারকারী টিমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হোক।