বিশেষ প্রতিনিধি, নাটোর
নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকেই জেলার প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। ঠিক মামলার পরদিনই নাটোরের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনওকে বদলি করার ঘটনা এই আলোচনাকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ আগস্ট। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফলকে কেন্দ্র করে দুই উপজেলায় বিক্ষোভ ও ইউএনও কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটে। এ সময় সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এর পাঁচ দিন পর ১৭ আগস্ট লালপুর ও বাগাতিপাড়া থানায় পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করা হয়, যেখানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীসহ দেড়শ থেকে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
এই আইনি পদক্ষেপের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই ১৮ আগস্ট রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আসে চাঞ্চল্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে লালপুরের ইউএনও মো. বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। সরকারি আবাদে এই রদবদলকে কেবল ‘প্রশাসনিক প্রয়োজন’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, সময় এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে প্রশ্ন উঠেছে,এটি কি নিছক রুটিন বদলি, নাকি সাম্প্রতিক ঘটনার কোনো নেপথ্য প্রভাব?
এই বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো। নাটোর জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে ঢালাওভাবে নেতাকর্মীদের গায়েবি মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় প্রতিনিধি ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিনিধিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরপরই যদি মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়, তবে তা মাঠ প্রশাসনের স্বাধীন কার্যক্রমে একটি নেতিবাচক ও ভীতিকর বার্তা পাঠাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আইনের প্রয়োগ হওয়া উচিত সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ। অপরাধ যেই করুক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা যেমন কাম্য নয়, তেমনি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের সংস্কৃতিও প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
নাটোরের এই ঘটনা কেবল একজন ডিসি বা ইউএনওর বদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মাঠ প্রশাসনের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নীতিনির্ধারণী মহলের স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এই বদলির কারণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং লালপুর ও বাগাতিপাড়ার অনভিপ্রেত ঘটনার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। কারণ প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মহলের চাপের ভয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, তবে তার দীর্ঘমেয়াদী খেসারত পুরো রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।