মন বাগানের মালী
-মাধুরী ব্যানার্জী
গ্রামের এক প্রান্তে থাকতেন বৃদ্ধ মালী হরিপদ। তাঁর ছোট্ট ফুলের বাগান ছিল সবার প্রিয়। গোলাপ, রজনীগন্ধা, শিউলি, গাঁদা—প্রতিটি গাছ যেন তাঁর স্নেহে প্রাণ পেত। গ্রামের মানুষ বলত, "হরিপদ শুধু ফুলের মালী নন, তিনি মানুষের মনেরও মালী।"
একদিন শহর থেকে এল অর্ণব নামে এক তরুণ। চাকরি হারিয়ে, বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় ভেঙে পড়েছিল সে। মুখে হাসি নেই, চোখে নেই ভবিষ্যতের আলো। গ্রামের নির্জনতায় কয়েকদিন কাটানোর জন্য সে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠল।
প্রতিদিন সকালে অর্ণব দেখত, বৃদ্ধ মালী গাছের শুকনো পাতা তুলে দিচ্ছেন, আগাছা পরিষ্কার করছেন, শুকিয়ে যাওয়া গাছে জল দিচ্ছেন। অবাক হয়ে সে একদিন জিজ্ঞেস করল,
— “যে গাছটা প্রায় মরে গেছে, তাকে এত যত্ন করছেন কেন?”
হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,
— “গাছ কখনো নিজের মুখে বলে না, সে বাঁচতে চায়। কিন্তু যত্ন পেলে অনেক শুকনো ডালেও আবার কুঁড়ি ফোটে।”
কথাটি অর্ণবের মনে গভীর দাগ কাটল।
এরপর থেকে সে প্রতিদিন মালীর সঙ্গে বাগানে কাজ করতে শুরু করল। আগাছা তুলতে তুলতে সে বুঝতে পারল—মানুষের মনেও কত অপ্রয়োজনীয় অভিমান, রাগ, হিংসা আর হতাশা জমে থাকে। সেগুলো সরিয়ে না ফেললে সুখের ফুল ফুটতে পারে না।
কয়েক মাস পরে অর্ণব শহরে ফিরে গেল। নতুন কাজ শুরু করল। কিন্তু যাওয়ার আগে বৃদ্ধ মালীর হাতে একটি ছোট্ট চারা গাছ দিয়ে বলল,
— “আপনি আমাকে ফুল চাষ শেখাননি, শিখিয়েছেন মনের বাগান কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়।”
হরিপদ হাসলেন। তাঁর চোখে তখন তৃপ্তির আলো।
বহু বছর পরে গ্রামের মানুষ দেখল, অর্ণব একটি বিদ্যালয় গড়েছে। সেখানে বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের শেখানো হয় ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ক্ষমা আর সততার পাঠ। বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে বড় অক্ষরে লেখা—
“মন যদি বাগান হয়, তবে ভালোবাসাই তার জল, আর বিবেক তার মালী।”
সেদিন গ্রামের মানুষ বুঝল, একজন সত্যিকারের মালী শুধু ফুল ফোটান না; তিনি মানুষের অন্তরেও আশার বীজ বুনে দেন। সেই বীজ একদিন মহীরুহ হয়ে অসংখ্য জীবনকে ছায়া দেয়।