ধরি মাছ, না ছুঁই পানি—বাংলাদেশের সামনের পথ
বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডটি একদিনে হয়নি। এর প্রতিটা ইটের নিচে আছে হাজার বছরের গল্প। অবিভক্ত ভারত ভেঙে দ্বিজাতিতত্ত্বের পথে পাকিস্তান, তারপর পশ্চিমের শোষণে পূর্বের ক্ষত। সেই ক্ষত থেকেই ১৯৭১। নয় মাস রক্ত, নয় মাস আগুন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটা জাতি দাঁড়িয়ে বলেছিল “আমরা বাঁচব”। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশটা হাঁটছে, হোঁচট খাচ্ছে, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর। এই সময়ে আমরা স্বপ্ন দেখেছি সাম্য, মানবিকতা আর গণতন্ত্রের। কিছু সময় আলো দেখেছি, আবার বেশির ভাগ সময় অস্থিরতা আমাদের সঙ্গী হয়েছে। ক্ষমতা আসা-যাওয়ার খেলায় রাষ্ট্রযন্ত্র কখনো জনগণের, কখনো দলের হয়ে গেছে। ২০২৪-এর নির্বাচন, তারপর “মেধা না কোটা” থেকে শুরু হয়ে এক দফার গণ-অভ্যুত্থান—সব মিলিয়ে ছাত্র-জনতার রক্তে আরেকটা অধ্যায় লেখা হলো। শত শত প্রাণ গেল, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে রইল। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিল, তাদের কারো কারো নাম আজ মানুষের মুখে মুখে। আবার কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে।
আজকের বাংলাদেশ একটা চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে। একদিকে আওয়ামী লীগ—যাদের হাত ধরে স্বাধীনতা এসেছিল, যাদের কোটি কোটি সমর্থক এখনো নীরবে ভালোবাসে। দীর্ঘ শাসনে তাদের ভুল-ত্রুটি ছিল, আবার উন্নয়নের ছোঁয়াও ছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের কার্যালয় পুড়েছে, নেতা-কর্মী নিগৃহীত হয়েছে। শেখ হাসিনা এখন দেশের বাইরে থেকে দলকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে বিএনপি—দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ে ক্ষমতায়। জনগণ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে ভরসার চোখে। কিন্তু দলের ভেতর থেকে চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর আসলে সেই ভরসায় ফাটল ধরে। আর জামায়াত-শিবির ও তাদের রাজনৈতিক সহযোগী এনসিপি—তারা ‘২৪-এর আন্দোলনে সামনের কাতারে ছিল, এখন প্রশাসন আর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তাদের ঘিরে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো—আমরা প্রতিপক্ষকে “দালাল” বলতে শিখে গেছি। একদলকে ভারতের, আরেকদলকে পাকিস্তানের। অথচ পতাকাটা সবার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। একাত্তরের গ্লানি, ফাঁসি, নিষিদ্ধতা, তারপর আবার পাল্টা হিসাব—এই চক্র থেকে আমরা বের হতে পারছি না।
এই অবস্থায় দেশবাসী অস্থির। কারণ, মানুষ রুটি-রুজি চায়, সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চায়, রাস্তায় শান্তি চায়। রাজনীতির মারপ্যাঁচ নয়।
তাহলে উপায় কী? উপায় হলো “ধরি মাছ, না ছুঁই পানি”—মানে চরমপন্থা না, মধ্যপথ।
প্রথম কথা, ইতিহাসকে অস্বীকার করা যাবে না। আওয়ামী লীগ ছাড়া ‘৭১ হয় না, এটা যেমন সত্য। তেমনি ৫৪ বছরে মানুষের যে হতাশা জমেছে, সেটাও সত্য। তাই ইতিহাসকে হাতিয়ার না বানিয়ে শিক্ষা বানাতে হবে।
দ্বিতীয় কথা, ক্ষমতায় যে-ই আসুক, তাকে প্রমাণ করতে হবে সে দলের না, দেশের। বিএনপি আজ ক্ষমতায়। তাদের সামনে সুযোগ আছে—নিজেদের নেতা-কর্মীকে বলা, “ক্ষমতা মানে সেবা, লুট না।” মানুষ সেটাই দেখতে চায়। আর যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিত হয়েছে, তাদেরও মনে রাখতে হবে—জনগণ নায়ক বানায়, আবার দায়ও চায়।
তৃতীয় কথা, প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। এক দল আরেক দলের অফিস ভাঙলে, নেতা-কর্মীকে নিগৃহীত করলে—জিতে যায় হিংসা, হেরে যায় রাষ্ট্র। ‘৭১-এ আমরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়েছি, কারণ তারা মানুষকে মানুষ মনে করেনি। আজ যদি আমরাও একে অন্যকে মানুষ না মনে করি, তাহলে সেই ‘৭১-এর শহীদদের কাছে আমরা কী জবাব দেব?
সবশেষে, বাংলাদেশ কারো বাপের না, কারো একারও না। এটা ১৮ কোটি মানুষের। কৃষক, শিক্ষক, গার্মেন্টস কর্মী, রিকশাওয়ালা, ছাত্র—সবার। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রতিযোগিতা করা—কে বেশি স্কুল বানাবে, কে বেশি হাসপাতাল দেবে, কে বেশি চাকরি দেবে—সেই প্রতিযোগিতা। গালির প্রতিযোগিতা নয়।
বন্যা আসবে, ঝড় আসবে, রাজনীতির টানাপোড়েনও আসবে। কিন্তু এই দেশ টিকে থাকবে, যদি আমরা “আমার দল”-এর আগে “আমার দেশ” বলতে শিখি।
আজকের অস্থিরতা কেটে যাবে। শুধু দরকার একটু ধৈর্য, একটু সহনশীলতা, আর অনেকখানি দেশপ্রেম।
কারণ লাল-সবুজের পতাকা একটাই। আর সেই পতাকার নিচে আমাদের সবার জায়গা আছে।
(বি. দ্র. লেখা ও ছবি তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।)
খন্দকার মো. জসীম উদ্দিন
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক।