টিলা কেটে কোটিপতি প্রভাবশালী চক্র, ভাঙছে রাস্তা, দেখার কেউ নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট:
সিলেটের পীরের বাজার ও পীরের চক এলাকায় পরিবেশ আইন ও সরকারি নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড় ও টিলা। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেই চলছে এই ধ্বংসযজ্ঞ। ফলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টিলাগুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট। এ নিয়ে স্থানীয় জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, পীরের চক এলাকার কুশিয়ারা হাউজিংয়ের শেষ মাথায় উত্তর দিকে অবস্থিত সরকারি 'শ্বশান টিলা' কেটে সাবাড় করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে স্থানীয় মৃত আহমদ আলী ওরফে মাকু মিয়ার ছেলে ছাদন মিয়া, জিয়া উদ্দিন জিরাই ও কালা মিয়ার নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, শাহপরান থানার কতিপয় কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে এই চক্রটি রাতারাতি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। এই চক্রের সাথে স্থানীয় ভূমিখেকো হিসেবে পরিচিত ফয়াজ মিয়ার ছেলে বশির ও আনোয়ারসহ ফয়জুর রহমান ফয়জু, সাইদ এবং বদরুল ইসলাম আজাদ সরাসরি জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগে আরও জানা যায়, প্রতিদিন রাতে শত শত ট্রাকে করে এই টিলা কাটার মাটি সিলেটের বিভিন্ন প্লটে ভরাট করার চুক্তি (কন্ট্রাক্টরি) বাস্তবায়ন করছে এই সিন্ডিকেট। টিলা কাটার মাটি পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত সিলেট-ড-১১-০৫২৯, সিলেট-মেট্রো-জ-১১-০০৫৬, ঢাকা-মেট্রো-হ-২৫৪৩ সহ একাধিক ডাম্প ট্রাক ও ড্রাম ট্রাকের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই বলেও জানা গেছে।
সারারাত ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে পীরের চক ১নং ও ২নং রোডের রাস্তাগুলো ভেঙে এখন চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "একদিকে মাটি কাটার কারণে আমাদের রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, অন্যদিকে সারারাত ট্রাকের বিকট শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারে না। আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি। এখানে যেন টাকা আর ক্ষমতার জোরে সব আইন অন্ধ হয়ে গেছে।"
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি সরকারি শ্বশান টিলা কাটার পাশাপাশি সরকারের বিপুল পরিমাণ খাস জমি ও জায়গা দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি চক্রের প্রধান ছাদন মিয়া নিজের বাড়িটিও সরকারি জায়গার ওপর নির্মাণ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও তামাবিল হাইওয়ে রোডের পীরের বাজার 'হাজী ভিলা' সংলগ্ন স্থানে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে রাস্তার মাত্র ১০ ফুটের ভেতর জায়গা দখল করে ইট, বালু ও পাথরের রমরমা ব্যবসা চালানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
স্থানীয়দের দাবি, পাথর উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর কড়াকড়ি দেখালেও ঐতিহ্যবাহী পাহাড় ও টিলা কাটার মহোৎসবের দিকে তাদের কোনো নজর নেই। কোনো সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করতে গেলে দলীয় ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একের পর এক উদাসীনতায় সাধারণ মানুষের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে— আসলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজ কী?
শুধু পীরের বাজারই নয়, সিলেটের আখালিয়া এলাকার জগদীশের টিলাসহ বিভিন্ন স্থানে এভাবে টিলা কাটা ও সরকারি ভূমি দখল চলছে। সিলেটের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে অনতিবিলম্বে এই ভূমিখেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, টিলা কাটা বন্ধ এবং সরকারি জমি উদ্ধার করতে ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন সিলেটবাসী।