নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে (৭) ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত রিকশা মেকানিক জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর প্রধান আসামি জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে দ্রুত ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল আসামিদের ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে ঘাতক জাকির নিজের জঘন্য অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সিঁড়ি থেকে যেভাবে নিখোঁজ হয় রামিসা
নিহত রামিসা আক্তার পল্লবীর একটি স্থানীয় স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তারা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বহুতল ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাটে বসবাস করে আসছিলেন। দুই বোনের মধ্যে রামিসা ছিল ছোট।
গত মঙ্গলবার সকালে বড় বোনের সাথে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার পরপরই সিঁড়ি থেকে নিখোঁজ হয় রামিসা। চারদিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তিনতলার ঠিক উল্টো পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার এক পাটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তার মা।
বিভৎস দৃশ্য ও লাশ উদ্ধার
জুতা দেখে মায়ের মনে সন্দেহ জাগলে তিনি ওই ফ্ল্যাটের দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা দিতে থাকেন ও ডাকাডাকি করেন। কিন্তু ভেতর থেকে দীর্ঘক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ৯৯৯-এ কল পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তল্লাশি চালিয়ে ঘরের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাপ্লুত দেহ এবং শৌচাগার (বাথরুম) থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, রামিসার মা যখন বাইরে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ভেতরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হচ্ছিল। মূল আসামি যেন বাথরুমের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে পারে, সেই সময়টুকু করে দিতেই তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার দীর্ঘক্ষণ প্রধান দরজা খোলেননি।
কে এই ঘাতক জাকির?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান অভিযুক্তের নাম জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা। সে পেশায় একজন রিকশা মেকানিক। তার আদি বাড়ি নাটোর এলাকায়। নাটোরে তার বিরুদ্ধে পূর্বে একটি চুরির মামলা ছিল, যেখানে সে কিছুদিন জেল খেটে জামিনে বের হয়। জামিন পাওয়ার পর মাত্র দুই মাস আগে সে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে নিয়ে পল্লবীর ওই ভবনের ফ্ল্যাটটি সাবলেট (ভাড়া) নেয়।
গ্রেপ্তারকৃত স্ত্রী স্বপ্নার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, জাকির হোসেন চরম বিকৃত মানসিকতা ও হিংস্র প্রকৃতির লোক। সে প্রায়ই নিজের স্ত্রীর ওপরও পাশবিক নির্যাতন চালাত।
পুলিশের বক্তব্য ও বিকৃত নির্যাতনের চিত্র
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত এবং আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিশু রামিসাকে ফুসলিয়ে ঘরে এনে তার ওপর বিকৃত যৌন নির্যাতন চালানো হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শিশুটির কান্নাকাটির কারণে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাকে শ্বাসরোধ ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এরপর আলামত ধ্বংস ও লাশ গুমের উদ্দেশ্যে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
"বিচার হবে না"—বিদ্ধস্ত বাবার আকুল আর্তনাদ ও জনমনে প্রশ্ন
এদিকে সন্তান হারিয়ে চরম ক্ষোভ আর বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর হতাশা থেকে নিহত রামিসার বাবা বারবার সাংবাদিকদের সামনে বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, "আমি স্ট্যাম্পে লিখে দিচ্ছি, এই ঘটনার বিচার হবে না!" একজন অসহায় বাবার এই হৃদয়বিদারক চ্যালেঞ্জ আজ পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ আজ এই বাবার পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রশ্ন তুলছেন—আসলেও কি রাষ্ট্র ও আইন এই নৃশংসতার সঠিক ও দ্রুত বিচার করতে পারবে?
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও ফাঁসির দাবি
লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পল্লবী থানায় দায়ের করা এই নৃশংস হত্যা মামলায় দুই আসামিকেই আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটির আকস্মিকতায় ও বর্বরতায় পুরো মিরপুর এলাকায় এখনো গভীর শোক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার এই নরপিশাচের দ্রুততম সময়ে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির জোর দাবি জানিয়েছেন, যেন আর কোনো বাবার কোল এভাবে খালি না হয়।