আমির হোসেন, সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার ‘রূপের রানী’ খ্যাত যাদুকাটা নদী এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। গত দুই দশকে ড্রেজার ও স্যালো মেশিন দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর প্রস্থ প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে এশিয়ার বৃহত্তম শিমুল বাগানসহ আশপাশের গ্রামগুলো এখন বিলীন হওয়ার পথে। তবে পরিবেশ বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে এখানকার বেপরোয়া চাঁদাবাজি। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে একদল অসাধু ব্যক্তি বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করলেও ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রেক্ষাপট বদলেছে; কিন্তু কমেনি দৌরাত্ম্য। বর্তমানে বিএনপির একটি প্রভাবশালী চক্র নেপথ্যে থেকে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত টোলের তোয়াক্কা না করে প্রতিটি বাল্কহেড বা নৌকা থেকে নির্ধারিত ৩০ পয়সার পরিবর্তে ১ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ফাজিলপুর এলাকায় চারটি ভিন্ন পয়েন্টে ঘর তুলে ‘যাদুকাটা-১’ ও ‘যাদুকাটা-২’ নামে অবৈধভাবে এই রয়্যালটি তোলা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ, উপজেলা প্রশাসনের ক্যাশ কালেকশন এবং ইজারাদারের টোল—সব মিলিয়ে কয়েক স্তরের এই চাঁদাবাজিতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ শ্রমিকদের। ভুক্তভোগীদের দাবি, দাবিকৃত অতিরিক্ত অর্থ না দিলে শ্রমিকদের আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। ইজারাদার জবা মিয়া ও তার ভাই সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এমনকি তথ্য সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকরা লাঞ্ছিত ও ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টার শিকার হয়েছেন। জেলা ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার অভিযোগ দিলেও দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার মেলেনি। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না। এ বিষয়ে স্থানীয় ভূমি কার্যালয় ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আইনি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন। অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের দাবি, নির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে যাদুকাটা নদী এখন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, যা নিরসনে সামাজিক প্রতিরোধ ও কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।