মাধুরী ব্যানার্জী
ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যচিন্তক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প: "বেহিসেবী ভালোবাসা"
বেহিসেবী ভালোবাসা
শহরের এক কোণে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে এসে বসত প্রণব। হাতে এক কাপ চা, চোখে দূরের পথ—আর মনে এক অদৃশ্য অপেক্ষা।
সেই অপেক্ষার নাম ছিল শ্রেয়া।
শ্রেয়া কখনো প্রণবকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবু প্রণব তার জন্য ছুটে বেড়াত। শ্রেয়ার পরীক্ষার আগে নোট জোগাড় করে দেওয়া, অসুস্থ হলে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, বৃষ্টির দিনে ছাতা নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা—সবই করত নিঃশব্দে।
একদিন শ্রেয়া বলল,
—“তুমি আমার জন্য এত কিছু করো কেন?”
প্রণব হেসে বলল,
—“ভালোবাসার কি আবার হিসেব থাকে?”
শ্রেয়া কিছু বলল না।
কয়েক মাস পর শ্রেয়ার বিয়ে ঠিক হলো। খবরটা শুনে প্রণবের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। বন্ধুরা বলল, “এবার নিজেকে সামলাও। এতদিন যা দিয়েছ, তার বিনিময়ে তো কিছুই পেলে না।”
প্রণব শান্ত গলায় বলল,
—“ভালোবাসা যদি বিনিময়ের আশায় দেওয়া হয়, তবে সেটা ভালোবাসা থাকে না।”
বিয়ের দিন প্রণব দূর থেকে শ্রেয়াকে দেখেছিল। শ্রেয়ার চোখে আনন্দ ছিল, আর প্রণবের চোখে ছিল অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
বছর দুয়েক পর এক শীতের সকালে শ্রেয়া আবার সেই চায়ের দোকানে এল। সঙ্গে ছোট্ট একটি ছেলে। প্রণব তখনও আগের মতোই দোকানের এক কোণে বসে চা খাচ্ছিল।
শ্রেয়া মৃদু হেসে বলল,
—“তুমি বদলাওনি!”
প্রণব বলল,
—“মানুষ বদলায়, ভালোবাসার কিছু স্মৃতি বদলায় না।”
শ্রেয়ার চোখে জল এসে গেল। সে বুঝল, জীবনে অনেক সম্পর্ক হিসেব করে তৈরি হয়, কিন্তু কিছু ভালোবাসা থাকে একেবারেই বেহিসেবী—যেখানে পাওয়ার চেয়ে দেওয়াটাই বড়।
প্রণব উঠে দাঁড়াল। চায়ের দাম মিটিয়ে সে চলে গেল।
পেছন থেকে শ্রেয়া তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—কিছু মানুষ জীবনে থাকার জন্য আসে না, তারা আসে ভালোবাসার অর্থটা শিখিয়ে দিতে।
আর সেই ভালোবাসার কোনো হিসেবের খাতা থাকে না।