রাজপথের এক অদম্য সৈনিকের না বলা কথকতা ও ত্যাগের উপাখ্যান
— রফিকুল ইসলাম
রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতার পালাবদল, নাকি কিছু মানুষের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও আদর্শের অপর নাম? বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) আদর্শকে যাঁরা হৃদয়ে ধারণ করেন, তাঁদের অনেকের জীবনই আজ এক একটি উপাখ্যান। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এই দীর্ঘ লড়াইয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের যে মূল্য চুকাতে হয়, তার এক জীবন্ত দলিল যেন আমার নিজের জীবনের কিছু স্মৃতি।
মনে পড়ে যায় সেই দুঃসময়ের দিনগুলোর কথা। যখনই দলের ডাকে কোনো কর্মসূচি বা আন্দোলন আসত, সব পিছুটান আর পরিবার পরিজনের মায়া ত্যাগ করে ঢাকার রাজপথে ছুটে যাওয়ার এক অদম্য তাগিদ অনুভব করতাম। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুপিচুপি পালিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশের অনেকেই উপহাস করে বলতো— "দেখো, বড় বিএনপি নেতা হয়ে গেছে!" কিন্তু তখন কে শোনে কার কথা? বুকের ভেতর তখন দেশপ্রেম আর দলের প্রতি ভালোবাসার এক অন্যরকম আগুন জ্বলত।
এলাকায় ফিরে আসার পর যখন জানতাম পুলিশি তালিকায় আমার নাম উঠেছে, তখন থেকেই শুরু হতো নতুন এক জীবন—পলাতক জীবন। নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে কখনো শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ঘর, কখনো অচেনা কোনো আত্মীয়ের বাসা, আবার কখনো কুঁড়েঘরে বালিশ ছাড়া নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। মাথার ওপর ঝুলন্ত মামলার খড়্গ নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা নারায়ণগঞ্জের এ বাসা থেকে ও বাসায় লুকিয়ে বেড়াতে হয়েছে মাসের পর মাস।
পরিবারের প্রিয় মুখগুলো, বিশেষ করে সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থাকার সেই যন্ত্রণা আজও বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের করে আনে। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েও স্বস্তি মেলেনি। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভয়ে কেউ যখন বলতেন, "আমরা তো অন্য দল করি, আমাদের এখানে কেন..." তখন পেটে ক্ষুধা থাকলেও আত্মসম্মানের টানে আর এক মুহূর্ত সেখানে টিকে থাকতে পারিনি। নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অজানা উদ্দেশ্যে হাঁটতে হয়েছে।
আজ দিন বদলেছে, দেশ নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর আজ বিএনপি ও মুক্তিকামী মানুষের সুদিন এসেছে। কিন্তু এই সুদিনের আলোয় অনেক সময় পেছনের সেই দিনগুলোর কথা, মাঠের নিঃস্বার্থ ত্যাগের কথা ম্লান হয়ে যায়। কোনো প্রাপ্তির আশায় তো আমরা রাজপথে নামিনি; আমাদের ভালোবাসা ছিল শর্তহীন, আদর্শিক।
তবুও একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে মনে জমে থাকা এই না বলা কথাগুলো আজ কেবলই স্মৃতির রোমন্থন নয়, এটি ইতিহাসের এক সত্য পাঠ। শত নির্যাতন, ক্ষুধা, অপমান আর পলায়নপর জীবন পেরিয়েও যাঁদের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়নি, সেই রফিকুল ইসলামরাই প্রমাণ করেন—আদর্শের রাজনীতি কখনো হারিয়ে যায় না। এই ত্যাগের ইতিহাস যেন হারিয়ে না যায়, কুঁড়েঘরের সেই দিনগুলোর কষ্ট যেন মূল্যায়ন পায়, এটাই আজ একজন সাধারণ কর্মীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।