আওরঙ্গজেব কামাল :
দেশে দিন দিন সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যাও। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল—প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই একাধিক প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স ক্লাব, অনলাইন সাংবাদিক সংগঠনসহ নানা নামে নতুন নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—সংগঠন যতটা বাড়ছে, সাংবাদিকতার মান কি ততটাই বাড়ছে? পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি কতটা হয়েছে? খোঁজ নিয়ে দেখা যায় অধিকাংশ অশিক্ষিত লোকরা দাপট খাটিয়ে এ পেশায় ঢুকে পড়ছে। অনেকের অভিযোগ এসব সাংবাদিকরা নিজের নামটি লিখতে ও ইংরেজিতে বলতে পারে না। এছাড়া সমাজের কিছু অসাধু ব্যক্তি ৎ তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে ঢাকতে হয়ে যাচ্ছে সাংবাদিক। অনেকেই আবার নিজের ব্যবসা হিসাবে ও তার অবৈধ ধান্দা করতে এ পেশায় নাম লেখাচ্ছেন। অথচ
সাংবাদিকতা একটি সাধারণ পেশা নয়। রাষ্ট্রের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অন্যায় ও মানুষের অধিকারহরণের ঘটনা তুলে ধরে জনগণের সামনে সত্য প্রকাশ করা সাংবাদিকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। ফলে সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম যেমন মানুষের অধিকার রক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার, তেমনি সেই কলমের অপব্যবহার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, গ্রুপিং, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। কোথাও একটি প্রেসক্লাব একাধিক ভাগে বিভক্ত, কোথাও একই এলাকার একাধিক সংগঠন নিজেদের প্রকৃত সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে দাবি করছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন সংগঠন গঠন করে অল্প সময়ের মধ্যেই নেতৃত্বের পদ নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে প্রকৃত ও পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই—এমন অনেক ব্যক্তিও বিভিন্ন সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা সাংগঠনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতার পরিচয় গ্রহণ করছেন,এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে একদিকে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকরাও সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। এটা আমার কথা নয় এটা দেশের সচেতন জনদের কথা। হয়তো এ প্রতিবেদনের পরে অনেকে আমাকে দোষারোপ করবে । কিন্তু আমি কোন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কিছু লিখছি না। যেটা সত্য সেটাই লিখছি।
সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন কেন?
সাংবাদিক হতে হলে শুধু একটি প্রেস কার্ড বা সংগঠনের পদবিই যথেষ্ট নয়। একজন সাংবাদিককে হতে হয় শিক্ষিত, সৃজনশীল, অনুসন্ধানী, মার্জিত, সাহসী ও নিরপেক্ষ। তাকে তথ্য যাচাই করতে হয়, দুই পক্ষের বক্তব্য নিতে হয়, ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হয় এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।
অথচ বিভিন্ন সময়ে এমন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত অভিজ্ঞতা কিংবা সংবাদ সংগ্রহ ও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় জ্ঞানও নেই। কেউ কেউ সংগঠনের পদ ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করছেন, আবার কেউ সাংবাদিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন,এমন অভিযোগও রয়েছে।
সব সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ প্রযোজ্য নয়। দেশের অসংখ্য সাংবাদিক প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করছেন, জীবন-জীবিকার ঝুঁকি নিচ্ছেন এবং সত্য প্রকাশের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সমস্যাটি মূলত তখনই তৈরি হয়, যখন পেশাদার সাংবাদিকতার সঙ্গে অ-পেশাদার আচরণ মিশে যায় এবং একটি ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর পড়ে।
সাংবাদিক লাঞ্ছিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো পেশা
সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার অন্যতম কারণ সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজনও। কোনো সাংবাদিক হামলার শিকার হলে বা পেশাগতভাবে বাধাগ্রস্ত হলে অনেক সময় সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। বরং সংগঠনভেদে অবস্থান নেওয়া, ব্যক্তিগত বিরোধ বা গ্রুপিংয়ের কারণে প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও বিভাজন তৈরি হয়।
ফলে সাংবাদিকের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা হয়রানির ঘটনা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায় না। একজন সাংবাদিক বিপদে পড়লে অন্য সাংবাদিক যদি পাশে না দাঁড়ান, তাহলে পেশাগত নিরাপত্তা দুর্বল হয়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে দাবি করলেই হবে না; সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেও পেশাগত ঐক্য, নৈতিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকতা নিয়ে নতুন বিতর্ক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নতুন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সাংবাদিক নিহত ও আহত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে বহু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, সহিংসতা, নাশকতা ও অন্যান্য অভিযোগে মামলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন IFJ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পাঁচ সাংবাদিক নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন সাংবাদিক আহত হন।
আবার ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে ৩২টি ফৌজদারি মামলায় অন্তত ১৩৭ সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছিল। এসব মামলায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, দাঙ্গা, অপহরণ, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি, হামলা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগও আনা হয়।
তবে মামলায় আসামি হওয়া এবং গ্রেপ্তার হওয়া এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি সাংবাদিকতা নিয়ে আলোচনা করার সময় অবশ্যই মনে রাখা জরুরি।
জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের নথিভুক্ত তালিকা
প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদন, পুলিশি তথ্য এবং সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় বিভিন্ন সময়ে যেসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার বা আটক হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন—
১. শাকিল আহমেদ — একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক হেড অব নিউজ। ২১ আগস্ট ২০২৪ বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করা হয় এবং পরে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
২. ফারজানা রূপা — একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ও উপস্থাপক। একই দিনে শাকিল আহমেদের সঙ্গে তাকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
৩. মোজাম্মেল হক বাবু একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সম্পাদক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
৪. শ্যামল দত্ত ভোরের কাগজের সম্পাদক। মোজাম্মেল হক বাবুর সঙ্গে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে আটক করা হয় এবং পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
৫. শেখ মোহাম্মদ জামাল হোসেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হন এবং পরে জামিনে মুক্তি পান।
৬. আরিফ হাসান দেশ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
৭. শওকত মাহমুদ সাবেক জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়।
৮. মনজুরুল আলম (পান্না) ২০২৫ সালের আগস্টে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় তিন মাস পর জামিনে মুক্তি পান বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৯. আনিস আলমগীর ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ধানমন্ডির একটি জিম থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ তিনি জামিন পান।
এ তালিকা মামলায় অভিযুক্ত সব সাংবাদিকের তালিকা নয় এবং এটিকে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার তালিকা হিসেবেও দেখা যাবে না। কারণ ২০২৫ সালের এপ্রিলেই অন্তত ১৩৭ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, অথচ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের তুলনায় অনেক কমসংখ্যক সাংবাদিক।
দীর্ঘদিন কারাগারে সাংবাদিক
২০২৬ সালের ৩ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, পাঁচজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তখনও বিচার ছাড়াই ৫৯৩ থেকে ৬২০ দিন পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। তাদের মধ্যে ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল হক বাবু, শ্যামল দত্ত ও সাংবাদিক-চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবিরের নাম উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত CPJ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ মে হাইকোর্ট ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদকে তাদের অধিকাংশ মামলায় জামিন দেন; তবে অন্যান্য মামলার কারণে তারা তখনও কারাগারে ছিলেন।
এই ঘটনাগুলো সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইনের আওতায় বিচার হবে; কিন্তু সাংবাদিকতার কাজ, মতামত, রাজনৈতিক অবস্থান বা কোনো সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শুধু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা নয়, সাংবাদিকদের ওপর হামলাও বাস্তবতা
জুলাই আন্দোলনের সময় সাংবাদিকরা শুধু মামলার শিকার হননি, অনেকে সরাসরি হামলা ও প্রাণহানির শিকার হয়েছেন। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস CPJ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুলিশের পাশাপাশি আন্দোলনকারী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা সাংবাদিকদের ওপর হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছিল।
IFJ-এর নথিতেও জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ সাংবাদিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সাংবাদিকতার সংকট একমুখী নয়। কখনো রাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, কখনো রাজনৈতিক কর্মী, কখনো আন্দোলনকারী, কখনো অপরাধী চক্র কিংবা কখনো সাংবাদিকের নিজের পরিচিতি ব্যবহারকারী অসাধু ব্যক্তিরাও গণমাধ্যমকর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারেন।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বনাম জবাবদিহি
সাংবাদিকের স্বাধীনতা মানে সাংবাদিক যা খুশি তাই করতে পারবেন এমন নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে। একজন সাংবাদিক যদি সত্য গোপন করেন, মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেন, কারও চরিত্রহনন করেন, ঘুষ গ্রহণ করেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে পেশাগত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
একইভাবে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তদন্ত, প্রমাণ, বিচার এবং আদালতের সিদ্ধান্ত এই আইনি প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবে।
সাংবাদিকতা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে দাঁড়ানোর পেশা না হয়ে যায়। সাংবাদিকের পরিচয় হবে সত্যের পক্ষে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকের অবস্থান পরিবর্তন করা নয়, বরং ক্ষমতায় যে-ই থাকুক তার কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার মূল কাজ।
সংগঠন থাকবে, কিন্তু সংগঠন যেন সাংবাদিকতার বিকল্প না হয়
সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার জন্য সংগঠন অবশ্যই দরকার। প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, কল্যাণ ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি যদি পেশাগত মান বৃদ্ধির পরিবর্তে শুধু পদ-পদবি, পরিচয়, প্রভাব ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বাড়ায়, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার জন্য ইতিবাচক নয়।
একটি এলাকায় একাধিক সংগঠন থাকতেই পারে। কিন্তু সংগঠনের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, পেশাগত মানদণ্ড এবং ঐক্য না থাকলে বিভক্তির প্রভাব পড়ে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর।
এখন প্রয়োজন সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন
সাংবাদিকতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই প্রয়োজন পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির প্রশিক্ষণ, সংবাদ সংগ্রহ ও যাচাইয়ের দক্ষতা, নৈতিক আচরণ এবং পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও উচিত সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করা। শুধু পরিচয়পত্র দেওয়া নয়, সদস্যের পেশাগত কার্যক্রম, সংবাদ প্রকাশের ইতিহাস ও সংগঠনের নৈতিক বিধিমালা মেনে চলার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আইন ও সংবিধান সম্পর্কে ধারণা, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সাংবাদিকতা রক্ষায় সাংবাদিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সাংবাদিকদেরও। সরকারকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে নিরাপত্তা দিতে হবে।
অন্যদিকে সাংবাদিকদেরও নিজেদের ঘর পরিষ্কার করতে হবে। সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত ব্যবসা, রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি কিংবা সামাজিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজকেই নৈতিক অবস্থান নিতে হবে।
কারণ একজন ভুয়া বা অদক্ষ সাংবাদিকের কারণে শুধু তার নিজের ক্ষতি হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো পেশাদার সাংবাদিকের সম্মান।
আজ তাই সময় এসেছে প্রশ্ন করার আমরা কি শুধু সাংবাদিক সংগঠন বাড়াব, নাকি সাংবাদিকতার মানও বাড়াব?
প্রেসক্লাবের সংখ্যা বাড়লেই সাংবাদিকতা শক্তিশালী হয় না। সংগঠনের নেতা বাড়লেই সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা বাড়ে না। সাংবাদিকতার শক্তি আসে সত্যনিষ্ঠা, যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, সাহস, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।
সাংবাদিক রাষ্ট্রের আয়না। সেই আয়না যদি পরিষ্কার থাকে, সমাজ নিজের সত্যিকারের চেহারা দেখতে পায়। আর আয়নাই যদি ময়লা হয়ে যায়, তাহলে প্রতিফলনও অস্পষ্ট হয়ে যায়।
তাই এখন সময় ‘কে কত বড় সাংবাদিক নেতা,এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করে ‘কে কতটা সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক’সেই প্রতিযোগিতা শুরু করার।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকতার নামে অপেশাদারিত্ব, অনৈতিকতা ও স্বার্থের রাজনীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হবে। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এই দুটির সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম এবং কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব।