বরেণ্য সাংবাদিক আতাহার ইকবাল চিরনিদ্রায় শায়িত, বিভিন্ন মহলের শোক
বিশেষ প্রতিবেদক:
প্রবীণ ও বরেণ্য সাংবাদিকরা হলেন সাংবাদিকদের জন্য বটবৃক্ষস্বরূপ।
তাঁদের দেখানো পথ, আদর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করে।
তাই তাঁদের প্রয়াণ বা চলে যাওয়া সাংবাদিকতা অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
পাঁচ দশকেরও বেশি কক্সবাজারের সাংবাদিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই মানুষটি আর আমাদের মাঝে নেই।
তিনি আর কেউ নন দৈনিক কক্সবাজার বাণীর প্রধান সম্পাদক, কক্সবাজার প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক আতাহার ইকবাল।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন আতাহার ইকবাল। ইন্নালিল্লাহি.....রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
তিনি স্ত্রী, একমাত্র ছেলে, অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
ঝুমবৃষ্টি উপেক্ষা করে বুধবার আসরের নামাজের পর কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জামে মসজিদে মরহুমের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়
কক্সবাজার প্রেসিডেন্ট।
জানাজায় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক বদিউল আলম, বর্তমান সভাপতি মাহবুবর রহমান ও মরহুমের একমাত্র ছেলে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
তাঁর মৃত্যুর খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিক সমাজসহ জেলাজুড়ে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করে।
তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায় মরহুমের বাড়িতে।
বুধবার মরহুম সাংবাদিক আতাহার ইকবালের মরদেহ সতীর্থ, শুভানুধ্যায়ী ও ভক্তদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কক্সবাজার প্রেসক্লাবে রাখা হয়। সেখানে মরহুমের আত্মার শান্তি কামনায় কোরআন খানি ও বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। এসময় সাংবাদিকতার মাধ্যমে সত্য উন্মোচনসহ ফেলে আসা জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের স্মৃতিচারণ করেন সাংবাদিক নেতারা।
কক্সবাজারের সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের নিয়ে একশো বছরের ইতিহাসলব্ধ ‘কক্সবাজার সাংবাদিক কোষ’ গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, আতাহার ইকবাল ছিলেন একাধারে-সাংবাদিক, সংগীত শিল্পী, গীতিকার, বেতার উপস্থাপক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
প্রবীণ এই সাংবাদিক ১৯৫৫ সালের ৩১ আগস্ট মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিশিষ্ট সমাজসেবক মরহুম ডা. আমান উল্লাহ, মাতা- মরহুমা মুশতারি বেগম সিদ্দিকী। ১৯৭২ সালে দৈনিক গণকন্ঠের কক্সবাজার প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি।
১৯৭৪ সালে পাক্ষিক তরঙ্গ সম্পাদনা করেন। ১৯৭৭ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় পাক্ষিক বারুদ। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক সাগরবাণী প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদনায়। দৈনিক জনকন্ঠের জন্মলগ্ন থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৮ সালে দৈনিক মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। ১৯৯৭ সালে দৈনিক বাঁকখালী প্রকাশনা শুরু করেন। তিনি ছিলেন এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। দৈনিক বাঁকখালীর নিয়মিত প্রকাশনা শুরু হয় ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ২০০৭ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি উক্ত পত্রিকার মালিকানা হস্তান্তর করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে দৈনিক মিছিল, দৈনিক পূর্বকোণ, নয়াবাংলা, দৈনিক খবর ও দৈনিক কক্সবাজারে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
আতাহার ইকবাল ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০৭ ও ২০০৮ সালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কক্সবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি কক্সবাজার প্রেসক্লাবের রজত জয়ন্তী উৎসবে দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত একটি সিরিজ রিপোর্টের জন্য সেরা সাংবাদিকতার পুরস্কার লাভ করেন।
এছাড়াও তিনি স্বাধীনতার পর থেকে অসংখ্য ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। তিনি কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত দৈনিক কক্সবাজারবাণী পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আতাহার ইকবাল জেলার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত কণ্ঠশিল্পী। বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভূক্ত গীতিকার ও সূরকার এবং কক্সবাজার কেন্দ্রের সংগীত প্রযোজক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার বেতার থেকে প্রচারিত ‘সাগর পাড়ের জীবন’ শীর্ষক আঞ্চলিক ভাষার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন।
তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তে যোগদান করেন এবং জাতীয়তাবাদী যুবদলের কক্সবাজার জেলা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে যুব মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত জাতীয় যুব সংস্থার কক্সবাজারস্থ কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি জেলা যুবদল ও বিএনপি সংগঠিত করার কাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে ১৯৮০ সালে হিজবুল বাহারে করে ৪ দিনের সমুদ্র বিহারে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। বর্তমানে বিএনপি’র কালচারাল ফ্রন্ট জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৯ সালে তিনি বাংলাদেশ লবণ চাষী সমিতি গঠন করেন এবং সভাপতি হন। লবণ সংক্রান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গুলোতে লবণ চাষীদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকায় বেশ কয়েক বছর অহেতুক লবণ আমদানি বন্ধ থাকে। যার ফলে লবন চাষীরা মাঠ পর্যাযে লবণের ন্যায্য মূল্য পায়।
তিনি ২০০১ সালে লবণ চাষী সমিতির সভাপতি হিসেবে ইউনিসেফ এর সহযোগিতায় সরকারিভাবে ১৫ দিনের ভারত সফরে যান এবং সেখানকার লবণ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজতকরণ বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন। আতাহার ইকবাল উপ মহাদেশের প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মরহুম আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর দৌহিত্র।
১৯৯১ সালে বিয়ে করেছেন মরহুম আবদুর রশিদ সিদ্দিকীর বড় ছেলে মরহুম মাশুক আহমদ ছিদ্দিকীর কন্যা ফেরদৌসী বেগম সিদ্দিকাকে। তিনি স্ব-পরিবারে কক্সবাজারে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি ২০০৯ সালে প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিক সংগঠন কক্সবাজার সাংবাদিক সংসদ (সিএসএস) আয়োজিত ‘সিএসএস’ কৃতি সাংবাদিক সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন।
বিভিন্ন মহলের শোক
সাংবাদিক আতাহার ইকবালের মৃত্যুতে কক্সবাজার সদর, ঈদগাঁও এবং রামু আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, নারী সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাষ্টের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবদুল্লাহ, কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সারওয়ার কামাল, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাফর, দৈনিক কক্সবাজারবাণী সম্পাদক ও প্রকাশক ফরিদুল মোস্তফা খান, কক্সবাজার সাংবাদিক সংসদ (সিএসএস) এর সভাপতি বাংলাদেশ বেতার কক্সবাজার এর সংবাদ অনুবাদক (সাব-এডিটর), লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক আজাদ মনসুর, সাধারণ সম্পাদক দৈনিক কর্ণফুলির কক্সবাজার প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী আব্দুল্লাহ নয়নসহ বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান মরহুমের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
শোক বার্তায় সকলে আতাহার ইকবালের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁর মাগফিরাত কামনা করেন।
তারা জানান, কক্সবাজারে সাংবাদিকতা পেশায় তাঁর দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, সততা ও অবদান কক্সবাজারের গণমাধ্যম অঙ্গনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে কক্সবাজারবাসী একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক, অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যমের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হারালো।