আব্দুস সামাদ
রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি
সম্প্রতি বন্যায় রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের অন্তত ৪৫০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চরাঞ্চলের বাদাম চাষে। পাশাপাশি আমন ধানের বীজতলা, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজিরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কুড়িগ্রামে। জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীসংলগ্ন এলাকায় ২৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া লালমনিরহাটে ৯০ হেক্টর, রংপুরে ৪৫ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৩৫ হেক্টর এবং নীলফামারীতে ৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আকস্মিক বন্যার কারণে অনেক খেতেই ফসল পরিপক্ব হওয়ার আগেই তুলতে হয়েছে। আবার কোথাও কয়েক দিন পানির নিচে তলিয়ে থাকায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে ফসল। এতে উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি লোকসানের আশঙ্কাও বেড়েছে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকার কৃষক নওশেদ আলী (৬৫) বলেন, তিস্তার চরে তিনি আট বিঘা জমিতে বাদামের আবাদ করেছিলেন। বন্যায় প্রায় দুই বিঘা জমির বাদাম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। বাকি ছয় বিঘার বাদাম তুলতে পারলেও ফলন আশানুরূপ হয়নি।
তিনি বলেন, “আমার মতো শতাধিক কৃষক চরে বাদাম চাষ করেছিলেন। সবার বাদামখেতই বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েক দিন পরে বন্যা হলে বাদাম পরিপক্ব হয়ে যেত, তখন এত ক্ষতি হতো না।”
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন (৬০) জানান, তিনি ১২ শতাংশ জমিতে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। বন্যার পানিতে প্রায় ৭০ শতাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি এলাকার কৃষক আজিজুল ইসলাম (৫৫) বলেন, তার ছয় বিঘা ভুট্টাখেতের মধ্যে এক বিঘার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি এক বিঘা সবজিখেতের প্রায় ৬০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, “খেত থেকে পানি নেমে গেছে। ২৫ শতাংশ জমির আমনের বীজতলাও পানির নিচে ছিল, তবে সেটার ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে।”
নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা এলাকার কৃষক জহির উদ্দিন (৫০) বলেন, দুধকুমার নদীর তীররক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নদীর পানি তাদের এলাকায় ঢুকে চার দিন ধরে ফসলি জমি প্লাবিত করে রাখে।
তিনি বলেন, “এখন মাঠে তেমন ফসল নেই। তবে আমনের বীজতলা আর সবজির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা গেছে, খেতের কোনো শাক-সবজিই আর বাঁচেনি। আমাদের গ্রামের প্রায় সব কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর কালমাটি এলাকার কৃষক বক্তার আলী (৬০) জানান, তার ১০ শতাংশ আমন ধানের বীজতলা, দুই বিঘা ভুট্টাখেত এবং ২০ শতাংশ জমির শাক সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, “মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি পুরো খেত ডুবিয়ে দেয়। আবার সেই পানি নামতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। এতদিন পানির নিচে থাকায় ফসল আর টেকেনি।”
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার চর মধুপুর এলাকার কৃষক সুধান চন্দ্র দাস (৬৫) বলেন, এবার চরাঞ্চলে বাদামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যার কারণে পরিপক্ব হওয়ার আগেই বাদাম তুলতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আর ১০-১২ দিন সময় পেলে বাদাম পুরোপুরি পরিপক্ব হতো। তখন বাম্পার ফলন পাওয়া যেত। আমার সাত বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘার বাদাম পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। বাকি জমিতেও অর্ধেকের কম ফলন হয়েছে।”
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “বন্যার আগে মাঠে তেমন কোনো প্রধান ফসল ছিল না। চরাঞ্চলে বাদাম এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় আমন ধানের বীজতলা, কিছু সবজি ও ভুট্টা ছিল। পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে দুধকুমার নদীসংলগ্ন এলাকার কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের সরকারি সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।