হাফিজ মাওলানা ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
মুসলিম সমাজে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের গুরুত্ব কেবল আইনি বা প্রশাসনিক কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধর্মীয় বিধান এবং পারিবারিক জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার এক মূলভিত্তি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী অফিসগুলোতে জনবল সংকট, অবৈধ নিয়োগ এবং নানা অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং জনভোগান্তি নিরসনে এই খাতে দ্রুত সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
সারাদেশের অসংখ্য ইউনিয়নে স্থায়ী কাজীর পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। এই শূন্য পদের সুযোগ নিয়ে এক এলাকার কাজী অন্য এলাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন, কিংবা বিভিন্ন জায়গায় অযোগ্য ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়োগ করা অ্যাসিস্ট্যান্টদের দিয়ে রেজিস্ট্রার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। যোগ্যতা ও শরিয়াহ জ্ঞানের সঠিক যাচাই ছাড়াই দলীয় বা অনৈতিক বিবেচনায় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের কারণে আজ কাজী অফিসগুলো দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
কাজী অফিসগুলোতে প্রধান প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে-
√ অতিরিক্ত ফি আদায়: সরকার নির্ধারিত নিবন্ধনের ফি তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ইচ্ছামতো কাবিন বা তালাক রেজিস্ট্রির জন্য কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করা হয়।
√ বাল্যবিবাহ প্রমোট করা: জালিয়াতি ও অসদুপায়ের মাধ্যমে ভুয়া জন্মসনদ বানিয়ে টাকার বিনিময়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে নিবন্ধন করার অভিযোগ অত্যন্ত সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
√ ভুয়া তথ্য ও নথি জালিয়াতি: আগের কিংবা পেছনের তারিখ দিয়ে ভুয়া কাবিননামা তৈরি, জাল তালাকনামা প্রস্তুত এবং ক্ষেত্রবিশেষে অর্থের বিনিময়ে বা কোনো তথ্য গোপন রাখতে রেজিস্টার বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলার মতো গুরুতর জালিয়াতি ঘটছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি সংস্থায় এ ধরনের চরম বিশৃঙ্খলা পারিবারিক কাঠামোর জন্য বড় ধরনের হুমকি স্বরূপ। অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত ও অসৎ নিকাহ রেজিস্ট্রারদের কারণে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ আইনি ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বর্তমান সরকারের প্রতি বিনম্র আহ্বান-
১. রাজনৈতিক বিবেচনা বা ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে অতীতের দিনে পাওয়া অবৈধ ও বিতর্কিত কাজী নিয়োগসমূহ দ্রুত বাতিল করতে হবে।
২. বিবাহ, তালাক, শরিয়াহ এবং আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখা সৎ, শিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিদের উপযুক্ত ও স্বচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে স্থায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক।
৩. ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করে সরকারি ফি প্রদর্শন ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করা দরকার, যাতে কোনো কাজী অতিরিক্ত ফি আদায় করতে বা তথ্য পরিবর্তন/নষ্ট করতে না পারেন।
জনভোগান্তি দূর করতে এবং এই স্পর্শকাতর খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার অতি দ্রুত কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে, এমনটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক,
কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, ইউনানী গবেষক ও চিকিৎসক।