ঝিনাইদা জেলা প্রতিনিধি:
সুবর্ণ বিশ্বাস।
"নারায়ণগঞ্জ, শিবু মার্কেট থেকে...! আমার ভাই মরলো কেন? বিচার চাই বিচার চাই।আকাশ-বাতাস কাঁপানো এমন হৃদয়বিদারক আর ক্ষুব্ধ স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল শিবু মার্কেট এলাকা। পোশাক কারখানার শ্রমিক তৌফিক ও আবু হাসানের নির্মম মৃত্যুর সঠিক বিচার এবং বকেয়া বেতন বৃদ্ধিসহ এক দফা দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছেন হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক। স্বজন আর সহকর্মীদের হারানোর শোকে এবং বঞ্চনার প্রতিবাদে তাঁদের এই ক্ষোভের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের পুরো এলাকায়।
ক্ষোভের দাবানল ও রাজপথ অবরোধ
গতকাল সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জের ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের শিবু মার্কেট এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন পোশাক কারখানার হাজারো শ্রমিক। তৌফিক ও আবু হাসান—দুই তরুণ শ্রমিকের আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সহকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চেপে রাখা অসন্তোষ ফেটে পড়ে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বা কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও অবহেলার শিকার হয়ে তাঁদের প্রাণ দিতে হয়েছে। "আমরা ঘাম ঝরাই, রক্তের দামে পোশাক বানাই, কিন্তু বিনিময়ে পাই শুধু লাশ আর বঞ্চনা," কান্নাভেজা কণ্ঠে এমনটাই বলছিলেন আন্দোলনরত এক নারী শ্রমিক।
আন্দোলনকারীরা ব্যানার, ফেস্টুন হাতে নিয়ে শিবু মার্কেট চত্বরে অবস্থান নেন এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। ফলে সড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
প্রধান দাবিগুলো:
আন্দোলনরত শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
শ্রমিক তৌফিক ও আবু হাসান হত্যার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার: ঘটনায় জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ক্ষতিপূরণ প্রদান: নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
বেতন বৃদ্ধি ও নিয়মিতকরণ: বর্তমান নিত্যপণ্যের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি করতে হবে এবং বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ: কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের ক্ষোভ
শিবু মার্কেটে সরেজমিনে দেখা যায়, সহকর্মীদের হারানোর বেদনায় কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক সাধারণ শ্রমিক। নিহত তৌফিক ও আবু হাসানের সহকর্মীরা জানান, তাঁরা শুধু তাঁদের বকেয়া পাওনা এবং একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ন্যায্য দাবির মাশুল দিতে হলো নিজের জীবন দিয়ে।
শ্রমিক নেতারা বলেন, "তৌফিক ও আবু হাসান শুধু দুটি নাম নয়, তাঁরা হাজারো মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি। রক্ত দিয়ে তৈরি এই পোশাক শিল্পের কারিগরদের জীবন আজ একদম সস্তা হয়ে গেছে। বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।"
প্রশাসন ও শিল্প পুলিশের বক্তব্য
ঘটনাস্থলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ ও শিল্প পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে জানানো হয় যে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি মালিকপক্ষের সাথে আলোচনা করে বেতন বৃদ্ধি ও বকেয়া পাওনার বিষয়ে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
তবে রাজপথে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শুধু মুখে আশ্বাস নয়, লিখিত প্রতিশ্রুতি এবং তৌফিক ও আবু হাসানের বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
উপসংহার
নারায়ণগঞ্জের এই শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক অসন্তোষ ও হাহাকার কেবল এক অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি পুরো তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি যে শ্রমিকের হাত ধরে আসে, তাঁদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাজপথে ঝরে যাওয়া তৌফিক ও আবু হাসানের রক্তের সঠিক বিচার এবং শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে দিয়ে দ্রুত এই পরিস্থিতির সমাধান হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের।