আব্দুস সামাদ
রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি।
আগামী ৮ নভেম্বর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব দীপাবলি। অন্ধকার দূর করে আলোয় ভুবন ভরিয়ে তোলার এই উৎসবকে সামনে রেখে রংপুর অঞ্চলের কুমারপাড়াগুলো এখন কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। কারও হাতে কাদামাটি, কেউ ব্যস্ত প্রদীপের আকার দিতে, আবার কেউ সেগুলো রোদে শুকিয়ে চুল্লিতে পোড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দিনরাতের এই কর্মব্যস্ততার মধ্যেই মাটির প্রদীপ তৈরির মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যেও সমৃদ্ধির আলো জ্বালানোর স্বপ্ন দেখছেন কুমার পরিবারের সদস্যরা।
রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম—এই পাঁচ জেলার তিন হাজারের বেশি কুমার পরিবার এখন মাটির প্রদীপ তৈরিতে ব্যস্ত। স্থানীয়ভাবে এসব প্রদীপ ‘দিয়ার’ নামে পরিচিত। দীপাবলির আগে বাজারের চাহিদা মেটাতে গত এক মাস ধরে চলছে তাদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞ। পরিবারের নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুরাও যে যার মতো কাজে সহযোগিতা করছে। প্রতিটি পরিবার ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রদীপ তৈরি করছে।
কুমারদের কাছে দীপাবলি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনের মৌসুমও। বছরের অন্য সময় মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা কম থাকায় অনেক পরিবারকে জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়তে হয়। ফলে দীপাবলির আগে কয়েক মাসের এই ব্যস্ততা তাদের সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। তবে কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
স্থানীয় বাজারে এখন প্রতি ১০০টি সাধারণ মানের প্রদীপ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। মাঝারি মানের প্রদীপের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং উন্নত মানের প্রদীপ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। কুমারদের ভাষ্য, মাটি সংগ্রহ, প্রদীপ তৈরি, শুকানো, পোড়ানো ও বাজারজাত করা—প্রতিটি ধাপেই শ্রম ও খরচ বাড়ছে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর কুমারপাড়া গ্রামের প্রভাত চন্দ্র পাল (৬৫) এবার প্রায় ৭৫ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছেন। কর্মশালায় প্রদীপ সাজিয়ে রাখার ফাঁকে তিনি বলেন, “পাইকাররা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে প্রদীপ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা আশপাশের বাজারেও বিক্রি করছি। আশা করছি, এবার ভালো লাভ হবে। আমাদের গ্রামে ৭০টি কুমার পরিবার প্রদীপ তৈরিতে ব্যস্ত। প্রত্যেকেই ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত প্রদীপ প্রস্তুত করেছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট কুমারপাড়া গ্রামের বিষাদ চন্দ্র পাল (৫৫) জানান, তারা ছোট, মাঝারি ও বড়—এই তিন ধরনের প্রদীপ তৈরি করেন। প্রতিটি প্রদীপ তৈরির পেছনে রয়েছে কয়েক ধাপের পরিশ্রম। প্রথমে কাদামাটি দিয়ে প্রদীপের আকৃতি দেওয়া হয়। এরপর রোদে শুকিয়ে চুল্লিতে পোড়ানো হয়। তিনি বলেন, “এখন ১০০টি প্রদীপ তৈরি করতে ২০ থেকে ৫০ টাকা খরচ হয়। মাটি ও কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। আমি ইতিমধ্যে ৬০ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছি। স্থানীয় বাজারে বিক্রিও শুরু হয়েছে। আমাদের গ্রামের ৪৫টি কুমার পরিবারই এবার ভালো আয়ের আশা করছে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার পালপাড়া গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী অজয় চন্দ্র পাল (৭৬) কাজ করছিলেন চুল্লির পাশে। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় তাঁর কাছে প্রদীপ পোড়ানোর কাজটি এখন অনেকটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচ হাজার প্রদীপ পোড়ানো যায়। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুল্লিতে আগুন জ্বলে। আগুন নিভে যাওয়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর প্রদীপগুলো বের করি। এবার আমাদের পরিবার ৭৫ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার পালপাড়া গ্রামের সুরেশ চন্দ্র পাল (৫০) নিজে প্রদীপ তৈরির পাশাপাশি পাইকারি সরবরাহের কাজও করেন। তিনি বলেন, “আমি এবার ৬৫ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছি। বিভিন্ন কুমারপাড়া থেকে প্রদীপ সংগ্রহ করে পাইকারদের কাছেও সরবরাহ করি। এবার দুই লাখ প্রদীপ বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছি। উৎসবের আগে চাহিদা বাড়ায় এখন ব্যস্ততা অনেক বেশি।”
রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার কুমারপাড়ার টুটুল চন্দ্র পাল (৫৫) মনে করেন, মাটির প্রদীপের এই মৌসুমি বাজারই এখনো অনেক কুমার পরিবারের টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন। তিনি বলেন, “দীপাবলিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রতিটি পরিবার ৬০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করে। এই টাকা বছরের অন্য সময় সংসারের সংকট সামাল দিতে কাজে লাগে।”
তবে ঐতিহ্যবাহী এই পেশায় আগের মতো মানুষের আগ্রহ নেই। টুটুল চন্দ্র পাল জানান, তাদের গ্রামে ৫৫টি কুমার পরিবার থাকলেও অর্ধেকের বেশি পরিবার এখন আর মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে না। অনেকে পেশা বদলে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। যারা এখনো বংশপরম্পরার এই পেশা ধরে রেখেছেন, তাদেরও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, “আমার পরিবার এবার ৮০ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছে। স্থানীয় হাটে বিক্রি করছি। দীপাবলির সময় প্রদীপ বিক্রির আয় আমাদের জন্য অনেক বড় ভরসা।
রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা অশোক সরকার (৭০) বলেন, “প্রতিবছর বাড়ি, মন্দির ও দোকানে জ্বালানোর জন্য ৭০০ থেকে ৮০০টি প্রদীপ কিনি। এবার এক হাজার প্রদীপ জ্বালানোর পরিকল্পনা করেছি। দীপাবলির রাতে মাটির প্রদীপের আলোয় চারপাশ আলোকিত হলে মনে একধরনের শান্তি অনুভব করি।
পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার হিন্দু পরিবার বসবাস করে। দীপাবলি উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার ৩০০ থেকে ৮০০টি পর্যন্ত প্রদীপ কেনে। এসব প্রদীপ বাড়ি, মন্দির, শ্মশান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানো হয়। ফলে উৎসব ঘিরে প্রতিবছর মাটির প্রদীপের একটি বড় বাজার তৈরি হয়, যার ওপর নির্ভর করে হাজারো মৃৎশিল্পী পরিবারের আয়-রোজগার।
রংপুর বিভাগীয় পুরোহিত সোসাইটির আহ্বায়ক ধীমান ভট্টাচার্য্য বলেন, “‘দিয়ার’ দীপাবলি উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রদীপ জ্বালানো শুধু আনন্দ বা আলোকসজ্জার বিষয় নয়, এটি প্রার্থনারও অংশ। এর মধ্য দিয়ে প্রয়াত আত্মার শান্তি এবং পৃথিবীতে সাম্য ও কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, “দীপাবলির রাতে যখন মাটির প্রদীপের আলোয় বাড়ির আঙিনা ও মন্দির আলোকিত হবে, তখন সেই আলোয় কুমারদের শ্রম ও স্বপ্নও প্রতিফলিত হবে। তারা সারা বছর কষ্ট করে এসব প্রদীপ তৈরি করেন। উৎসবের এই সময়ে ভালো বিক্রি হলে তাদের পরিবারেও স্বস্তি ফিরবে। কুমাররাও নিজেদের বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদ্যাপন করেন।