ইউপি প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা, অগণতান্ত্রিক বিতর্ক নয়, দক্ষ স্থানীয় সরকারের সময়োপযোগী দাবি
হা. মাও ডা. হাফিজুল ইসলাম লস্কর
সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘কমপক্ষে স্নাতক এবং ইউপি সদস্য প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি বা সমমান’ নির্ধারণের বিষয়ে যে আইনি ও সামাজিক আলোচনা শুরু হয়েছে, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কটি বেশ মুখর। এছাড়া ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি ও ইউপি সদস্য প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি, সাথে লাগবে শিক্ষাগত যোগ্যতা সার্টিফিকেটের মূলকপি। নির্বাচন কমিশন সচিব বরাত দিয়ে এরকম একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে৷ তবে নির্বাচন কমিশন সচিবের বরাতে ভাইরাল হওয়া পোস্টটি নির্বাচন কমিশন সচিবের মন্তব্য কি’ না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই ভাইরাল বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি একটি লেখায় জাতীয় সংসদ সদস্য ও ইউপি চেয়ারম্যানের পদের তুলনা টেনে এটি প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে যে, সংবিধানে সংসদ সদস্যদের জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত না থাকলে স্থানীয় সরকারে তা আরোপ করা অগণতান্ত্রিক। তবে গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এই যুক্তির গোড়াতেই রয়েছে এক ধরনের ‘অপ্রাসঙ্গিক তুলনা’ (False Equivalence) এবং প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টিহীনতা।
জাতীয় সংসদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ, দুটোর গণতান্ত্রিক গুরুত্ব থাকলেও এদের কাজের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংসদ সদস্যরা মূলত আইন প্রণয়ন, জাতীয় নীতি নির্ধারণ এবং বাজেট অনুমোদনের মতো সামষ্টিক কাজ করেন। সেখানে দলগত আলোচনা, স্থায়ী কমিটির বিশেষজ্ঞ মতামত ও সংসদীয় সচিবালয়ের সহায়তা থাকে।
অন্যদিকে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের পদটি কেবল রাজনৈতিক পদ নয়; এটি একটি সরাসরি নির্বাহী ও বিচারিক পদ। যেমন,
√ গ্রাম আদালতে বিচারকের আসনে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করা,
√ নথিপত্র ও রায় পর্যালোচনা করা,
√ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার নথিতে সরাসরি স্বাক্ষর করা। এসবের জন্য আইনগত অনুধাবন ক্ষমতা আবশ্যক। একজন ২য় শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সমপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করতে ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকাটা জনস্বার্থের অনুকূলে, কোনো বৈষম্য নয়।
বিতর্কের পক্ষে একটি দাবি করা হয়, ‘ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি সচিব থাকেন, তাই চেয়ারম্যানের ডিগ্রি না থাকলেও চলে।’ বাস্তবতা হলো, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যদি দাপ্তরিক ও আইনি কাগজ পড়তে বা বুঝতে অক্ষম হন, তবে পরিষদ পরিচালনায় সরকারি সচিব বা আমলাদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা তৈরি হয়। তখন নির্বাচিত প্রতিনিধির অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে অসাধু কর্মকর্তা বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধির ভুরি ভুরি নজির আমাদের গ্রামগঞ্জে বিদ্যমান।
জনপ্রতিনিধিকে যদি আমলার তৈরি ফাইলে না বুঝেই স্বাক্ষর করতে হয়, তবে সেখানে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব কোথায় রক্ষিত হয়? একজন শিক্ষিত চেয়ারম্যানই পারেন আমলাতন্ত্রের ওপর কার্যকর নজরদারি চালিয়ে জনস্বার্থ রক্ষা করতে।
বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ কোনো সনাতনী দপ্তর নয়। ভাতা প্রদান, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ডিজিটাল ভূমি সেবা এবং ই-টেন্ডারিংয়ের মতো কাজগুলো এখন প্রযুক্তি নির্ভর। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনায় চেয়ারম্যানের সরাসরি তদারকি প্রয়োজন। কেবল প্রবীণ বা জনপ্রিয় ব্যক্তি হলেই এই যুগে দক্ষ ও স্বচ্ছ সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণ দিয়ে অবশ্যই দক্ষতা বাড়ানো যায়, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার ফলে যে বুনিয়াদি বিশ্লেষণ ক্ষমতা তৈরি হয়, তা কয়েক দিনের সাময়িক প্রশিক্ষণে অর্জন করা অসম্ভব।
অতীতে আমাদের গ্রামীণ জনপদে প্রবীণদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার কম থাকায় শিক্ষিত প্রার্থীর অভাব ছিল এই কথা সত্যি। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রতিটি ইউনিয়নেই এখন পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষিত ও স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণের বসবাস।চেয়ারম্যান পদে ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত থাকলে শিক্ষিত তরুণ ও যোগ্য সামাজিক ব্যক্তিত্বরা স্থানীয় রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত হবেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত চাপানোকে সুযোগ কমানো না দেখে, বরং স্থানীয় রাজনীতিকে পেশাদারি ও যুগোপযোগী করার অনুঘটক হিসেবে দেখা সংগত।
জাতীয় সংসদ সদস্যদের পদেও শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে ভিন্ন আলোচনা হতে পারে। কিন্তু ‘সংসদে নেই, তাই ইউনিয়নেও রাখা যাবে না’ এই যুক্তি দেখিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান পদকে দক্ষতা ও শিক্ষার মানদণ্ড থেকে মুক্ত রাখাটা একটি দুর্বল যুক্তি। গণতন্ত্রের শক্তি অবশ্যই ভোটাধিকার, তবে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের ভিত্তি তৈরির জন্য পদের ধরন অনুযায়ী ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা কোনোভাবেই অগণতান্ত্রিক নয়। একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইউপি চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পদের প্রার্থীর স্নাতক বা নিম্নতম এইচএসসি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা বর্তমান যুগে অপরিহার্য ও আবশ্যিক।
লেখক,
কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, ইসলামী স্কলার, সংগঠক, ইউনানী গবেষক ও চিকিৎসক।